হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইন ২০২২: জানা অজানার অজানা তথ্য ও অধিকার

হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইন ২০২২: জানা অজানার অজানা তথ্য ও অধিকার


হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইন ২০২২: জানা অজানার অজানা তথ্য ও অধিকার

দক্ষিণ এশিয়ার  আইন ব্যবস্থা  বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দু পারিবারিক আইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয়। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার বিষয় দীর্ঘদিন ধরে সীমিত জীবনস্বত্ব (Life Interest) এবং প্রাচীন ধর্মীয় রীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়ে আসছে তাই আমাদেরকে হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইন ২০২২: জানা অজানার অজানা তথ্য ও অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে। 

এই লেখায় আমরা সম্পত্তি বন্টন, বিধবা নারীর আইনি সুরক্ষা এবং আদালতের সাম্প্রতি পর্যবেক্ষণ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা  করলাম  ।

হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ বাংলাদেশের হিন্দুদের সম্পত্তি বরগুন হয় মূলত দায়ভাগা আইন অনুযায়ী আর এই দায়ভাগ আইনে উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয় মৃত ব্যক্তির আত্মার উদ্দেশ্যে ‘পিণ্ডদান’ করার যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে।

পূর্বে বিধবা নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার অত্যন্ত সীমিত ছিল। তবে বর্তমান সময়ে  আদালতের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে  এই নীতিগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে :

১৯৩৭ সালের হিন্দু বিধবা নারীদের সম্পত্তিতে  অধিকার রক্ষার আইন (The Hindu Women's Rights to Property Act, 1937): 

১৯৩৭ সালের এই আইনের মাধ্যমে প্রথম হিন্দু বিধবা নারীকে স্বামীর সম্পত্তিতে এক  পুত্রসন্তানের সমান অংশ পাওয়ার অধিকার দেওয়া হয়।

১৯৪১ সালের রুলিং ও আইন গত  জটিলতা:

১৯৪১ সালে ভারত  ভাগের  পূর্বে আদালতের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল যে, ১৯৩৭ সালের আইনটি শুধুমাত্র স্বামীর অকৃষি জমির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, কৃষি জমির ক্ষেত্রে নয়। ফলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে হিন্দু বিধবারা স্বামীদের কৃষি জমি থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল।

ঐতিহাসিক মাইল ফলক রায় এবং বর্তমানে  আইন গত  অবস্থা :

 দীর্ঘ কয়েক দশকের  আইনগত অস্পষ্টতার অবসান গটিয়ে বাংলাদেশর  হাইকোর্টএকটি ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে ।উক্ত আইন বিশ্লেষণ করে  হাইকোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে ১৯৩৭ সালের আইনে 'সম্পত্তি' শব্দটি দ্বারা যেকোনো ধরনের সম্পত্তি তা হোক স্থাবর, অস্থাবর, বসতভিটা এবং কৃষিজমি সবকিছুকেই বোঝায়। এর ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দু বিধবা নারীরা স্বামীর বসতভিটার পাশাপাশি কৃষিজমিতেও সমান অধিকার ভোগ করার অধিকার লাভ করে ।

স্বামী মৃত্যুর পরে যদি কোন সন্তান থাকে তাহলে এক পুত্র সন্তানের সমপরিবারে সম্পত্তি বিধবা স্ত্রী
পাইবে |আবার যদি কোন সন্তান না থাকে তাহলে স্বামীর সকল সম্পত্তিতে স্ত্রী পূর্ণ জীবনী সত্ব পাইবে |

হিন্দু বিধবা নারীর সম্পত্তিতে অধিকার ও আইনগত  নিয়মাবলী

বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য আইন ও আদালতের নির্দেশিকা অনুযায়ী হিন্দু বিধবা নারীর সম্পত্তি সংক্রান্ত প্রধান অধিকারসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো :

১। পুত্রের সমান অংশ প্রাপ্তি

 যদি মৃত স্বামীর কোন সন্তান থাকে, তবে বিধবা স্ত্রী ১ জন পুত্র সন্তানের সমান অংশ পাবেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি ১ জন স্ত্রী এবং ২ জন পুত্র রেখে মারা যান, তবে তার সম্পত্তি স্ত্রী এবং দুই পুত্রের মধ্যে সমান ৩ ভাগে ভাগ হবে (প্রত্যেকে ১/৩ অংশ পরে পাবেন)।

২ । জীবনস্বত্ব (Life Interest) এর ব্যাপ্তি

হিন্দু আইন মোতাবেক একজন নারী তার স্বামী হইতে অথবা পিতা হইতে যে সম্পত্তি প্রাপ্ত হন তাকে  জীবনস্বত্ব বলে । বিধবা নারী আজীবন ঐ  সম্পত্তির  ভোগদখল করতে পারবেন। তিনি সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয় ভোগ করতে পারবেন। বিধবা নারী মৃত্যুর পরে ওই সম্পত্তি স্বামীর নিজ গোত্রের ওয়ারীদের নিকট ফিরে যাবে ।

৩। সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তরের বিশেষ অধিকার

বিধবা স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে জীবনস্বত্ব পেলেও নির্দিষ্ট কিছু চরম আইনি প্রয়োজনে (Legal Necessity) বিধবা নারী সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারেন। আইনি কারণগুলো হচ্ছে  (১) মৃত স্বামীর শ্রাদ্ধ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা জন্য।(২)মৃত স্বামীর দেনা পরিশোধ করার জন্য।(৩) বিধবা স্ত্রী নিজের ও নাবালক সন্তানদের জীবনধারণ, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় এর জন্য। (৪) অবিবাহিত কন্যার বিবাহের খরচ বহন করার জন্য ।

জানা ও অজানার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিধবা নারী পুনরায় বিবাহ করেলে  :

বিধবা নারী পুনরায় বিবাহ করলে ১৮৫৬ সালের আইন অনুযায়ী মৃত স্বামীর হইতে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে অধিকার হারাবেন।

কৃষি ও অকৃষি জমি:

 বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশী উচ্চ আদালতের রায় মোতাবেক একজন হিন্দু বিধবা নারী স্বামীর কৃষি জমি ও অকৃষি জমি উভয় জমিতে অধিকার পাইবে। 

স্ত্রী অসতী হলে :

হিন্দুদের প্রাচীন আইন দায়ভাগ  অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুর সময় স্ত্রী অসতী প্রমাণিত হলে ঐ স্ত্রী স্বামীর উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

বন্টন বা বাটোয়ারা মামলা:

স্বামী মৃত্যুর পরে বিধবা নারী নিজের অংশের  দখল পেতে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা (Partition) মামলা দায়ের করতে পারে।


কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা বা (FAQ)

প্রশ্ন ১।  হিন্দু বিধবা নারী কি তার স্বামীর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন?

উত্তর: সাধারণ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন হিন্দু বিধবা নারী তার স্বামীর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারে না তবে বিশেষ আইনি প্রয়োজনে একজন হিন্দু নারী তার স্বামীর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন আইনি কারণগুলো যেমন, (১) মৃত স্বামীর শ্রাদ্ধ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা জন্য।(২)মৃত স্বামীর দেনা পরিশোধ করার জন্য।(৩) বিধবা স্ত্রী নিজের ও নাবালক সন্তানদের জীবনধারণ, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় এর জন্য। (৪) অবিবাহিত কন্যার বিবাহের খরচের জন্য ।

প্রশ্ন ২। বিধবার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি কে পাবে?

উত্তর: বিধবার মৃত্যুর পর তার জীবন সত্যের সম্পত্তি তার স্বামীর নিজ গোত্রের আইনগত ওয়ারিশগণ পাইবে ।

 আইন গত  পরামর্শ

বাংলাদেশে হিন্দু উত্তর অধিকার আইনে বিধবা নারীর সম্পত্তিতে অধিকার রক্ষার জন্য উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং ১৯৩৭ সালের হিন্দু বিধবা নারীর সম্পত্তিতে অধিকার রক্ষার আইন । অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেছে । তাই আমাদের উচিত  সম্পত্তি সংক্রান্ত বাটোয়ারা বা যে কোনো আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে স্থানীয় দেওয়ানি আদালতের একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।


Post a Comment

Previous Post Next Post