পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির আইনগত নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: সম্পূর্ণ নির্দেশিকা
আমাদের বাংলাদেশে পৈতৃক সম্পত্তি বা জমি জমা বিষয় অর্থনৈতিক লেনদেন বা হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পাদন করতে হয়। বাংলাদেশের ভূমি আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন এবং মুসলিম উত্তরাধিকারী আইন /হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পৈতৃক জমি বা সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে বেশ কিছু আইনগত নিয়ম মেনে মেনে চলতে হয়। তাই আমাদেরকে জানতে হবে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির আইনগত নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কি কি দরকার ।
এদেশের আইনি নিয়ম না মেনে বা সঠিক কাগজপত্র ছাড়া পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করলে পরে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং হস্তান্তর বাতিলের মতো মারাত্মক ঝামেলা হতে পারে। আজকের এই লেখনীতে আমরা পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির সম্পূর্ণ আইনগত নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, শরিকদের অধিকার এবং লক্ষণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব ।
১। আমাদেরপৈতৃক সম্পত্তি কী এবং এর স্বত্বাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে?
আমাদের দেশে পৈতৃক সম্পত্তি বা জমিজমা বলতে বোঝায় যে সম্পত্তি আমাদের পূর্বপুরুষ হইতে আমরা প্রাপ্ত হই যেমন, পিতা, পিতামহ (দাদা), প্রপিতামহ এদের কারো কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা কে বোঝায়।
আমাদের বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, মূল মালিকের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ওই মৃত্যু ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশগণন স্বয়ংসক্রিয়ভাবে ঐ সম্পত্তির যৌথ মালিক বা সহ অংশীদার ভিত্তিক মালিক হয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত সকল সকল ওয়ারিশগণ এর সম্মতিতে উক্ত সম্পত্তিতে বন্টননামা বা বাটোয়ারা দলিলের মাধ্যমে পৃথক করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতি দাগি সকল ওয়ারিশের যৌথ মালিকানা থাকে।
২ |পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির পূর্বে করণীয় আইনি কাজ গুলি
পৈতৃক জমিজমা বা সম্পত্তি বেচার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর রেজিস্ট্রি করার আগে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ধাপে ধাপে করতে হয় |
ক | ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহ
কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পরে তার বৈধ ওয়ারিশদের তালিকা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র এর নিকট হইতে স্মারক সম্মিলিত বৈধ ওয়ারিশ সনদপত্র সংগ্রহ করতে হবে । এই সনদে উল্লেখ থাকবে মূল মালিকের জীবিত সকল ওয়ারিশের নাম, পরিচয় ও সম্পর্ক |
খ | যৌথ নামজারি ও নামজারি খতিয়ান তৈরি
মূল মালিকের মৃত্যুর পরে ওয়ারিস কায়েম সনদ সংগ্রহ করে নিজ উপজেলার এসিল্যান্ড অফিসের মাধ্যমে পূর্ববর্তী মালিকের নামের রেকর্ড কর্তন করে বর্তমানে ওয়ারিশ সনদে বর্ণিত ওয়ারিশগণের নামে নাম জারি করতে হবে |
গ | আইনগত বন্টননামা বা বাটোয়ারা দলিল
যৌথ সম্পত্তি বেচার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে রেজিস্ট্রেশন আইন ২০০৪-এর ধারা ১৭এ অনুযায়ী আপোষ বন্টন দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে | এবং আপস বন্টন দলিলে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ থাকবে যে , কোন ওয়ারিশ সম্পত্তির কোন অংশ (চৌহদ্দি) তে কতটুকু পাবে | আপোষ বন্টন দলিল রেজিস্ট্রি করা থাকলে সম্পত্তি বিক্রির সময় কোন ধরনের ঝামেলা হয় না ।
৩ । পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির সময় শরিকদের অধিকার এবং অগ্রক্রয় অধিকার
পৈতৃক জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সহ-শরীক বা অন্য ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে যে সকল বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে , (ক )অন্যান্য সহ-শরিকদার ও ওয়ারিশদের অধিকার ও সম্মতি ছাড়া পৈতৃক সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশ বিক্রি করলে আইনগত ভাবে জটিলতা তৈরি হয় । সম্পত্তি যদি অবিভক্ত থাকে, তবে কোনো ওয়ারিশ শুধু তার আনুমানিক অংশ বিক্রি করতে পারেন, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো চিহ্নিত চৌহদ্দি বা অংশ হস্তান্তর করতে পারেন না। (খ) আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা এবং মুসলিম আইন অনুযায়ী, কোনো শরিক যদি তার অংশ তৃতীয় পক্ষের কারো কাছে বিক্রি করতে চান, তবে অন্যান্য সহ-শরিকদের সেই জমি আগে কেনার অধিকার থাকে ।(গ) কোনো শরিক যদি অন্য শরিক কে না জানিয়ে তৃতীয় পক্ষের কারো কাছে সম্পত্তি বিক্রি করেন, তবে বাকি শরিকরা আদালতে ‘অগ্রক্রয় মামলা’ (Pre-emption Suit) দায়ের করে ওই বিক্রি বাতিল করিয়ে নিজ নামে জমি রেজিস্ট্রি করে নিতে পারেন।
৪ । পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
পৈতৃক সম্পত্তি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বিক্রি ও হস্তান্তর করার জন্য বিক্রেতাকে নিচে বর্ণিত কাগজপত্র গুলি কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে যেমন , (ক ) মূল মালি কের নামের দলিল (খ) সিএস/এসএ/আরএস /বি আর এস বা সিটি জরিপ এর খতিয়ানের কপি । (গ) যদিরেজিস্ট্রিকৃত বন্টননামা দলিল থাকে তা । (ঘ)বিক্রেতার নামে থাকা নামজারি (মিউটেশন) এর খতিয়ান ও হালনাগাদ বছরের ভূমি উন্নয়ন কর এবং বিক্রেতা ও ক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও ছবি ।
৫ । অপ্রাপ্তবয়স্ক (নাবালিকা/নাবালক) ওয়ারিশ থাকলে আইনগত নিয়ম
বাংলাদেশের আইন মোতাবেক পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যদি কেউ নাবালক নাবালক (১৮ বছরের নিচে) থাকে, তবে তার অংশের সম্পত্তি বিক্রি করার প্রক্রিয়া সাধারণ নিয়মের থেকে ভিন্ন হয় যেমন, (১ ) অভিভাবক আইন (Guardians and Wards Act, 1890) অনুযায়ী বাবা বা অন্য কোনো প্রকৃত অভিভাবক চাইলেই নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন না। (২) নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে নিজ জেলা আদালত থেকে স্পষ্ট অনুমতি নিতে হয়। (৩) আদালতকে বোঝাতে হয় যে এই সম্পত্তি বিক্রি করা হবে নাবালকেরকল্যাণ জন্য , শিক্ষা বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য । আদালত সন্তুষ্ট হলে তবেই বিক্রির অনুমোদন দেবে আর আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করা হলে, ঐ নাবালক প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ৩ বছরের মধ্যে আদালতে মামলা করে সেই হস্তান্তর দলিল বাতিল করতে পারে।
৬ । যে সকল ধাপে ধাপে পৈতৃক সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করা হয়
যে সকল ধাপে ধাপে পৈত্রিক সম্পত্তি র রেজিস্ট্রি করা হয় তা হচ্ছে ,( ১ ).সিএস, এসএ, আরএস এবং বিএস খতিয়ানের সাথে মূল মালিকের নামের মিল আছে কিনা তা যাচাই করা যাচাই এবংওয়ারিশান সনদের সত্যতা নিশ্চিত করা ।(২) সকল সহ অংশীদারদের সম্মতিতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে আপন বন্টন দলিল রেসকি করে রেজিস্ট্রি করে নিজ উপজেলার এসিল্যান্ড অফিসে গিয়ে নাম জারি করা।(৩) নর্দান ঠিক হলে দরদাম ঠিক হলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটি বায়না পত্র চুক্তি সম্পাদন করতে হবে ।(৪) সম্পত্তি যে এলাকায় ঐ এলাকার একজন অভিজ্ঞ দলিল লেখকের সাহায্যে সরকারি সকল প্রকার ফি জমা দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের গিয়ে রেজিস্টির কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
৭। সাধারণ ভুল ও সতর্কতা
(১) অংশীদারি সম্পত্তি সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ না করে রাস্তার ধারের মূল্যবান অংশ একা বিক্রি করার চেষ্টা করবেন না। এতে মামলা হওয়ার ঝুঁকি থাকে।(২) বাংলাদেশের বাহিরে অবস্থানরত কোনো ওয়ারিশের পক্ষে জমি বিক্রি করতে হলে অবশ্যই দূতাবাস থেকে সত্যায়িত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আনতে হবে। (৩) কেহ যদি ভুয়া ওয়ারিশ সনদের মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রি করে তবে তা ফৌজদারি অপরাধ (Criminal Offence) হিসেবে গণ্য হবে এবং রেজিস্ট্রি স্বয়ংসক্রিয়ভাবে বাতিল হয়।
কিছু সাধারন প্রশ্নাবলী বা (FAQ)
প্রশ্ন ১। সহ-শরিকরা সম্মতি না দিলে কি পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করা সম্ভব?
উত্তর: কোন সম্পত্তি অবিভক্ত ভাবে থাকলে অন্য সহ-শরিকদের সম্মতি ছাড়া সুনির্দিষ্ট অংশ বিক্রি করা খুবই কঠিন কাজ। এ জন্য আমাদেরকে প্রথমে আদালতে ‘বাটোয়ারা মামলা’ (Partition Suit) দায়ের করে নিজের অংশ আইনগতভাবে পৃথক করে নিতে হবে।
প্রশ্ন ২। পৈতৃক জমি নামজারি না করে বিক্রি করা যাবে কি?
উত্তর: না, বাংলাদেশের নতুন ভূমি আইন ও রেজিস্ট্রেশন নিয়ম অনুযায়ী যিনি বিক্রি করবেন তার নামে নাম জারি খতিয়ান ও হালশনের খাজনা দাখিলা না থাকিলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় না । পৈতৃক সম্পত্তি কেনাবেচা সংক্রান্ত কোন ধরনের সমস্যা দেখা দিলে একজন দেওয়ানী বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই ভালো ।
