বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ২০২০ অনুযায়ী কন্যা ও বিধবাদের অধিকার


বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ২০২০ অনুযায়ী কন্যা ও বিধবাদের অধিকার


বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ২০২০ অনুযায়ী কন্যা ও বিধবাদের অধিকার: একটি বিস্তারিত ও আইনি পর্যালোচনা

আমাদের বাংলাদেশী হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরিবারে নারী—বিশেষ করে কন্যা ও বিধবাদের সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার অধিকার একটি অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান সময়ে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংস্কার ও নতুন প্রস্তাবিত আইন ২০২০ (Hindu Inheritance Act 2020 Proposal) নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাই আমাদের জানতে হবে বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ২০২০ অনুযায়ী কন্যা ও বিধবাদের অধিকার |

এই লেখায় আমরা বাংলাদেশের  হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের ঐতিহাসিক ভিত্তি, প্রচলিত দায়ভাগ আইন এবং সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত আইনের আলোকেই কন্যা ও বিধবাদের সম্পত্তিতে অধিকারের আলোচনা করব

১ । বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের প্রেক্ষাপট (দায়ভাগ পদ্ধতি)

আমাদের বাংলাদেশে প্রচলিত দায়ভাগ শাস্ত্রীয় আইন অনুযায়ী হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি বণ্টন  হয়ে আসছে। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য স্থানে 'মিতাক্ষরা' বা আধুনিক  বিধিবদ্ধ আইন চালু থাকলেও আমাদের বাংলাদেশে এখনও অতিপ্রাচীন শাস্ত্রীয় দায়ভাগামত প্রাধান্য পায়।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

(১)পুরুষতান্ত্রিক অগ্রাধিকার: ঐতিহাসিক দায়ভাগা মত অনুযায়ী পুরুষেরাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পত্তির পূর্ণ মালিক হয় (২)সীমিত সত্ত্ব : হিন্দু নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পত্তি লাভ করে জীবনী সত্ব  হিসেবে অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই সম্পত্তি নারী ভোগ দখল করিতে পারিবে কিন্তু বিশেষ কারণ ছাড়া বিক্রি করিতে পারিবে না ।

২ । প্রস্তাবিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ২০২০: কী রয়েছে নতুন খসড়ায়?

আমাদের বাংলাদেশের আইন কমিশন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার সুরক্ষার জন্য হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ২০২০ -এর খসড়া ও সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করে। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো প্রাচীন ঐতিহাসিক বৈষম্য দূর করে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা ।


প্রধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহ:

(১) কন্যাদের সমান অধিকার: পিতা বা মাতার সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যা উভয়কেই সমান অংশ পাবে। (২) বিধবা নারীদের পূর্ণাঙ্গ মালিকানা: মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে তার বিধবা স্ত্রী শুধুমাত্র জীবনস্বত্ব পাবেন না বরং সম্পত্তি বিক্রি করার পূর্ণাঙ্গ অধিকার পাবে । (৩)বিবাহিত ও অবিবাহিত কন্যার বৈষম্য দূরীকরণ: পৈত্রিক সম্পত্তিতে বিবাহিত কন্যা ও অবিবাহিত কন্যা উভয়ই সমান অংশ পাবে ।

৩। সম্পত্তিতে হিন্দু কন্যার অধিকার (প্রচলিত আইন বনাম প্রস্তাবিত আইন)

আমাদের বাংলাদেশী হিন্দু পরিবারে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার তাদের বৈবাহিক অবস্থান এবং কন্যাদের পুত্র সন্তান আছে কিনা অনেকটা তার উপরে নির্ভর করে নির্ভর করে।

ক। প্রচলিত দায়ভাগ আইনে কন্যার অবস্থান

(১)অবিবাহিত ও সন্তানবতী কন্যা: যদি কোন মৃত হিন্দু ব্যক্তির পুত্র সন্তান না থাকে তবে তার সম্পত্তি প্রথমত অবিবাহিত কন্যা এবং পুত্র সন্তান আছে এবং পুত্র সন্তান সম্ভাবনাময় কন্যাএমন কন্যা পিতার সম্পত্তি পাইবে (২)সন্তানহীন বা কন্যাসন্তানের মা: হিন্দু শাস্ত্রীয় আইন মতে যে সকল কন্যা সন্তানদের পুত্র সন্তান নাই শুধুমাত্র কন্যা সন্তান আছে অথবা যে সকল কন্যারা বন্ধ্যা তারা পিতা সম্পত্তি পাইবে না।(৩)পুত্রের উপস্থিতি: আমাদের বাংলাদেশী প্রচলিত হিন্দু দায়ভাগামত অনুযায়ী কারো যদি পুত্র সন্তান থাকে তাহলে কোন ধরনের কন্যারাই বিচার সম্পত্তির কিঞ্চিত অংশ পাইবে না ।

খ। প্রস্তাবিত ২০২০ সালের আইনের সুফল

(১)পুত্রের সমান স্বত্ব: এই আইন অনুযায়ী কোন মৃত্যু হিন্দু ব্যক্তির স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিতে একমাত্র সন্তান যা পাবে ঠিক তার সমপরিবারে এক কন্যা সন্তান পাবে ।(২) পূর্ণাঙ্গ মালিকানা: পিতা হইতে প্রাপ্ত বা অর্জিত সম্পত্তিতে কন্যা পূর্ণাঙ্গ মালিকানা লাভ করিবে এবং তিনি তার ইচ্ছামত দান বা বিক্রি করিতে পারিবে

৪। বিধবাদের সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার 

আমাদের বাংলাদেশে  হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে  কাজ করে ।

ক। ১৯৩৭ সালের হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার আইন 

আমাদের বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ১৯৩৭ সালের হিন্দু বিধবাদের সম্পত্তিতে অধিকার রক্ষা আইন কার্যকর রয়েছে এই আইন অনুযায়ী (১) মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রী এক পুত্রের সমপরিমাণ সম্পত্তি পাইবে ।তবে এটি "সীমিত স্বত্ব" (Widow's Estate)। বিধবা স্ত্রী বেঁচে থাকা পর্যন্ত ঐ সম্পত্তি ভোগদখল বা ভাড়া থেকে আয় করতে পারবেন, কিন্তু বিশেষ কারণ ছাড়া উক্ত সম্পত্তি বিধবা স্ত্রী হস্তান্তর তুলতে পারিবে না। বিধবা স্ত্রীর মৃত্যুর পরে ঐ  সম্পত্তি স্বামীর নিজ গোত্রে ফিরে যাবে ।

খ। প্রস্তাবিত ২০२० আইনের আওতায় বিধবার অধিকার

(১ ) প্রস্তাবিত আইন বাস্তবায়ন হলে স্বামীর সকল ধরনের সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রী পূর্ণাঙ্গ মালিকানা পাবেন।(২) প্রচলিত আইনে বিধবা পুনরায় বিবাহ করলে স্বামীর সম্পত্তিতে  অধিকার হারানোর ঝুঁকি থাকে। নতুন প্রস্তাবে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

৫ । এবং আইনি বাস্তবতা যা  সাধারণ মানুষের জানা জরুরি

আমাদের বাংলাদেশের  সংবিধানের সংবিধিবদ্ধ নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড  যেমন: CEDAW সনদে স্বাক্ষর অনুযায়ী  লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

আইনি সচেতনতা ও আইনি পরামর্শ:

১ । বর্তমান আইনি অবস্থান: আমাদের বাংলাদেশ বর্তমানে আইন সংস্কারের খসড়া ও প্রস্তাব থাকলেও তা এখনো জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়ে সরকারি  গেজেট প্রকাশ হয়ে  পরিপূর্ণ কার্যকরী আইনে পরিণত হয়নি । ফলে বর্তমানে কোনো বিরোধ দেখা দিলে ১৯৩৭ সালের আইন ও প্রচলিত শাস্ত্রীয় দায়ভাগ নীতি অনুযায়ী আদালত সিদ্ধান্ত  দেন। ( ২ )উইল বা দানপত্র (Gift/Will): বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশে আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও  পিতা বা স্বামী জীবিত অবস্থায় তার স্ত্রী বা কন্যাদের নামে রেজিস্ট্রি কৃত দানপত্র দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তির পরিপূর্ণ মালিক করে দিতে পারেন ।

৬। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আইন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু নীতিগত ও সামাজিক মতামত পরিলক্ষিত হয় যেমন , (১) সুরক্ষা ও মানবাধিকার: মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে যে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল না হলে বিধবা নারী ও কন্যারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন। (২) পারিবারিক ঐতিহ্য ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি: তবে সমাজের কিছু লোক  মনে করে, হঠাৎ আইন পরিবর্তন করলে পারিবারিক বিবাদ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সঠিক আইনগত  কাঠামো তৈরি করা ও আলোচনার মাধ্যমে সুষম মধ্যপন্থা অবলম্বন করা সম্ভব।

উপসংহার

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ২০২০-এর প্রস্তাব হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীদের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় একটি  যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত  দায়ভাগ আইনের 'সীমিত স্বত্ব' থেকে বেরিয়ে এসে কন্যা ও বিধবাদের সম্পত্তিতে পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রদান করা হলে এদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত ভাবে বৃদ্ধি পাবে ।


Post a Comment

Previous Post Next Post