ওয়ারিশি সম্পত্তি নামজারি করার নিয়ম ২০২৬: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও খরচ
পৈতৃক বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি নিজের নামে সরকারি বালামে রেকর্ডভুক্ত করার একমাত্র আইনগত পদ্ধতি হলো ওয়ারিশি সম্পত্তি নামজারি (Mutation)। যদি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন তবে তার রেখে যাওয়া জমি বা সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন হয়, কিন্তু রেজিস্ট্রি বা বন্টননামা দলিল থাকা সত্ত্বেও যদি সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি করা না হয়, তবে সেই জমিতে নিজের নামে খাজনা দেওয়া যায় না এবং জমির পূর্ণ মালিক হওয়া যায় না। তাই আমাদের জানতে হবে ওয়ারিশি সম্পত্তি নামজারি করার নিয়ম ২০২৬: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও খরচ কত |
এই লেখায় আমরা ওয়ারিশি সম্পত্তি নামজারি করার ২০২৬ সালের সর্বশেষ নিয়মা ও সঠিক পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খরচ এবং আইনি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।
ওয়ারিশি নামজারি বা ফারায়েজ মিউটেশন কী এবং কেন এটি করা জরুরি?
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তার আইনগত উত্তরাধিকারীগণ যেমন, (স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ইত্যাদি) ইসলামী ফারায়েজ আইন অনুযায়ী ঐ সম্পত্তির মালিক হন। তবে সরকারি রেকর্ডে মৃতের নাম পরিবর্তন করে জীবিত ওয়ারিশদের নামে জমি রেকর্ড করার নামই ওয়ারিশি নামজারি।
নামজারি না করার ঝুঁকি ও জটিলতা:
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জমি বিক্রয় বা হস্তান্তর করার জন্য সম্পত্তিতে পূর্ববর্তী মালিকের নামের রেকর্ড কর্তন করে নিজ নামে নাম জারি করতে হবে । পূর্বের খতিয়ানের মালিকের নামে সরাসরি খাজনা পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয় তাই নিজের নামে খাজনা দেওয়ার জন্য নামজারি করা অত্যন্ত জরুরি । কেউ ভুল তথ্য দিয়ে আপনার নিজের প্রাপ্য জমি অপর ব্যক্তি নিজের নামে খতিয়ানভুক্ত করে নিতে পারে তাই আপনাকে সম্পত্তিতে নিজের অংশে নাম পত্তন করাতে হবে । জমি সরকারি কোনো কাজে অধিগ্রহণ করা হলে নামজারি খতিয়ান ছাড়া ক্ষতিপূরণের টাকা তোলা অসম্ভব তাই আপনাকে নাম জারি করাতে হবে।
ওয়ারিশি সম্পত্তি নামজারি করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Checklist 2026)
২০২৬ সালের হালনাগাদ নিয়ম অনুযায়ী ই-নামজারি আবেদন অনলাইনে land gov bd এর মাধ্যমে করতে হয়। তাই আমাদের অনলাইনে নামজারির আবেদন করার আগে নিচে বর্ণিত প্রতিটি কাগজের স্ক্যান কপি PDF আকারে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে:
১ । মূল প্রাথমিক প্রমাণপত্র:
মৃতের নামে থাকা সর্বশেষ নামজারি বা সিএস/এসএ/আরএস/বিএস/সিটি জরিপ খতিয়ান। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র বা সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত মূল মৃত্যু সনদ (Digital Death Certificate)। স্থানীয় চেয়ারম্যান/মেয়র/কাউন্সিলর দ্বারা ইস্যুকৃত সকল ওয়ারিশদের নাম, বয়স ও সম্পর্কের স্পষ্ট বিবরণসহ ওয়ারিশ সনদ।
২। ওয়ারিশ ও আবেদনকারীর পরিচয়পত্র:
জীবিত সকল ওয়ারিশদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও মোবাইল নম্বর। সকল আবেদনকারী ওয়ারিশদের ছবি ।
৩। মালিকানা ও বন্টন সম্পর্কিত দলিল (যদি থাকে):
সব ওয়ারিশ মিলে জমি ভাগ করে নিলে রেজিস্ট্রি কৃত আপোষ বন্টননামা দলিল এর কপি ।ঐ খতিয়ানের জমির হাল নাগাদ (সর্বশেষ বছরের) পরিশোধিত ভূমি উন্নয়ন করের রশীদ।
ওয়ারিশি সম্পত্তি নামজারি করার নিয়ম (ধাপে ধাপে ২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী)
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে শতভাগ অনলাইনে নামজারির আবেদন করতে হয় ।
ধাপ ১। ডিজিটাল পোর্টালে প্রবেশ
প্রথমে বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (
ধাপ ২ ।আবেদনের ধরণ নির্বাচন
এরপরে আপনাকে নামজারি অপশন থেকে "উত্তরাধিকার সূত্রে/ওয়ারিশি নামজারি" ক্যাটাগরি বেছে নিতে হবে।
ধাপ ৩। তথ্য প্রদান ও ফাইল আপলোড
এরপরে আপনাকে মূল মালিকের (মৃত ব্যক্তি) নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র/তথ্য ও মৃত্যুর বিবরণ লিখুন। ওয়ারিশিয়ান সনদে থাকা প্রতিটি ওয়ারিশের নাম, এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর ও সম্পর্কের তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে । জমির অঞ্চল ভিত্তিক তথ্য যেমন, বিভাগ নাম জেলা নাম, উপজেলা নাম , মৌজার নাম ও নাম্বার, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং মোট জমির পরিমাণ স্পষ্টভাবে প্রদান করতে হবে। প্রস্তুতকৃত সকল কাগজ পত্রের সাইটটিতে নির্ধারিত সাইজ মেনে আপলোড করতে হবে ।
ধাপ ৪। প্রাথমিক প্রসেসিং ফি প্রদান
আবেদন জমা দেওয়ার সময় আপনাকে প্রাথমিক প্রসেসিং ফি এবং নোটিশ জারি ফি প্রদান করতে হবে। এটি আপনি বিকাশ, নগদ, রকেট বা যেকোনো অনলাইন ব্যাংকিং সার্ভিস দিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবেপরিশোধ করতে পারেন ।
ধাপ ৫ ।শুনানিতে অংশগ্রহণ ও নামজারি অনুমোদন
আবেদন অনুমোদনের পর এসি ল্যান্ড অফিস থেকে নোটিশ পাঠানো হবে এবং নির্ধারিত দিনে শুনানির খবর আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হবে। এবং শুনানির সময় আপনাকে সকল কাগজপত্রের মূল কপি সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় ভূমি অফিস/এসি ল্যান্ড অফিসে উপস্থিত হতে হবে।কোনো আপত্তি বা আইনি জটিলতা না থাকলে এসি ল্যান্ড সাহেব আপনার আবেদনটি মঞ্জুর করবেন।
ধাপ ৬ । খতিয়ান গ্রহণ ও ডি-খতিয়ান প্রিন্ট
আপনার আবেদন অনুমোদিত হলে নির্ধারিত ডি-সি-আর (DCR) ফি জমা দিয়ে অনলাইন থেকেই কিউআর কোড (QR Code) সংবলিত ডিজিটাল নামজারি খতিয়ান ডাউনলোড বা প্রিন্ট কপি আপনি নিতে পারবেন ।
২০২৬ সালে ওয়ারিশি সম্পত্তির নাম জারি করতে সরকারি খরচ (Cost Breakdown)
বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়ারিশি সম্পত্তি ই-নামজারির করার জন্য সরকারি ফি সম্পূর্ণ নির্ধারিত । অতিরিক্ত কোনো ফি প্রদান করার প্রয়োজন নেই। খরচের বর্ণনা যেমন,আবেদন ফি (Application Fee )২০টাকা । নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা । খতিয়ান বা পর্চা ফি ১০০ টাকা । ডিসিআর ফি ১১০০ টাকা । সর্ব মোট খরচ ১২৭০ টাকা ।
যৌথ নামজারি বনাম পৃথক নামজারি: কোনটি বেছে নেবেন?
ওয়ারিশি জমির ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি উপায়ে নামজারি করা যায়:
১। যৌথ খতিয়ান (Joint Khatian):
আমাদের সকল ওয়ারিশদের নাম একসাথে রেখে একটি একক খতিয়ান তৈরি করা যায়। এবং এখানে প্রত্যেক ওয়ারিশের নিজের অংশ শতক বা আনা-গণ্ডা-কড়া-ক্রান্তি হিসাবে উল্লেখ থাকে।
২। পৃথক খতিয়ান (Individual Khatian):
সকল ওয়ারিশদের সম্মতিতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে আপোস বন্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করে নিয়ে থাকলে প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজ নিজ জমির অংশ আলাদা করে নিজস্ব নামে পৃথক নামজারি খতিয়ান খুলে নিতে পারবে ।
ওয়ারিশি নামজারি করার সময় সাধারণ ভুল ও করণীয়
১। ওয়ারিশিয়ান সনদে তথ্য ভুল থাকা:
ওয়ারিশিয়ান সনদ আনার সময় কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে বা নামের বানান ভুল করলে এসি ল্যান্ড অফিস থেকে আবেদন বাতিল বা নামজারি স্থগিত করতে পারে। তাই আমাদেরআবেদন করার আগেই সনদ ভালোভাবে যাচাই করতে হবে ।
২ । হাল খাজনা অনাদায়ী থাকা:
আমাদেরকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে আমাদের পৈতৃক জমির নামজারি করার আগে অবশ্যই জমির আগের বছরের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে হবে।
৩ ।অনুমোদিত বন্টননামা না থাকা:
যদি ওয়ারিশদের মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ জমির দখল থাকে তবে এই ঝামেলা এড়াতে রেজিস্ট্রি কৃত বন্টননামা করাই ভালো ।
ওয়ারিশি সম্পত্তি নামজারি সম্পর্কিত কিছু সাধারন প্রশ্নোত্তর বা (FAQ)
১ । সব ওয়ারিশ মিলে কি একসাথে নামজারি আবেদন করতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, সকল ওয়ারিশদের নাম একত্রে অন্তর্ভুক্ত করে একটি যৌথ আবেদন করা যায় এবং এটিই ওয়ারিশি নামজারির জন্য সবচেয়ে ভালো নিয়ম।
২ ।কোনো ওয়ারিশ অনুপস্থিত বা প্রবাসে থাকলে কি নামজারি করা সম্ভব?
উত্তর: সম্ভব। প্রবাসে থাকা ওয়ারিশের এনআইডি/পাসপোর্ট এর তথ্য দিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে হবে এবং ব্যক্তি যে প্রবাসে থাকেন তার বৈধ প্রমাণ আবেদনের সাথে জমা দিতে হয়।
৩ | ই-নামজারি হতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: ২০২৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল সেবার নিয়ম অনুযায়ী সব তথ্য ও কাগজপত্র সঠিক থাকলে আবেদনের তারিখ থেকে ২৮ কার্যদিবসের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তি হওয়ার নিয়ম আছে ।
শেষ কথা
তাই আমাদের সকলের উচিত ওয়ারিশি জমি জমা নিজ দখলে রাখার পাশাপাশি তার আইনগত সুরক্ষার জন্য নামজারি করা জরুরি। ২০২৬ সালের আধুনিক অনলাইন ই-নামজারি সেবার মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই নামজারি আবেদন ও খতিয়ান সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। তাই আমাদের আর সময় নষ্ট না করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে দ্রুত অনলাইনে অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি করা উচিত ।
