স্ত্রীর সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক নিয়ম: কার কতটুকু প্রাপ্য?

স্ত্রীর সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক নিয়ম: কার কতটুকু প্রাপ্য?


স্ত্রীর সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক নিয়ম: কার কতটুকু প্রাপ্য? (ইসলামিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ)



ইসলামিক আইন এবং বাংলাদেশের পারিবারিক আইন অনুযায়ী, একজন নারী মারা গেলে তাঁর অর্জিত, এবং মহরানা হিসেবে পাওয়া বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সমস্ত সম্পত্তি তাঁর নিজেরই বলে গণ্য হয়। স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি  কে কতটুকু পাবেন, তা ইসলামিক ফারায়েয ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইন এর  ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। তাই আমাদেরকে স্ত্রীর সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক নিয়ম: কার কতটুকু প্রাপ্য? এ সম্পর্কে জানতে হবে |

অনেক সময় ভুল ধারণার কারণে মনে করা হয় যে, স্ত্রীর সম্পত্তি শুধু তাঁর বাপের বাড়ির লোক পাবেন বা কেবল স্বামীই সব পেয়ে যাবেন। বাস্তবে ইসলামিক আইনে এই বণ্টন অত্যন্ত  ভারসাম্যপূর্ণ।

১ । স্ত্রীর সম্পত্তি ভাগ বন্টনের আগে   জরুরী ভিত্তিতে যে কাজগুলো করতে হবে : 

কোনো মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টন করার পূর্বে ইসলামিক নীতি অনুযায়ী ৪টি মূল দায়িত্ব পূর্ণ কাজ  করতে হবে :

দাফন-কাফন এর  খরচ:


স্ত্রীর মৃত্যুর পরে   তার দাফন-কাফনের সমস্ত স্বাভাবিক খরচ তাঁর সম্পত্তি থেকেই করতে হবে (যদি স্বামী তা স্বেচ্ছায় বহন না করেন)।

ঋণ পরিশোধ:


স্ত্রীর জীবিত অবস্থায় কোনো দেনা-পাওনা বা ঋণ থাকলে তা স্ত্রীর সম্পত্তি বণ্টন করার আগে পরিশোধ করতে হবে।



অসিয়ত পূরণ করা:


স্ত্রী যদি তাঁর সম্পত্তির বিষয়ে কোনো বৈধ অসিয়ত করে থাকেন, তবে ঋণ ও দাফন খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ) অংশ পর্যন্ত ঐ  অসিয়ত কার্যকর করতে হবে।


  অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন করা :


উপরোক্ত কাজ করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তিই স্ত্রীর মূল উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন করতে  হবে।

২ | স্ত্রীর সম্পত্তির মূল উত্তরাধিকারীগণ কারা  এবং কতটুকু পাইবে?


স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির ওয়ারিশ হয় মূলত তার  স্বামী, ছেলে ও মেয়ে, এবং পিতামাতা এরা । পরিস্থিতিভেদে অংশগুলোর পরিবর্তন নিচে আলোচনা করা হলো:


ক | স্বামীর প্রাপ্য অংশ


স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর অংশ সম্পূর্ণ নির্ভর করে তাঁদের কোনো সন্তান  আছে কি না তার ওপর।

সন্তান থাকলে:


যদি মৃত স্ত্রীর সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) অথবা ছেলের সন্তান থাকে, তবে স্বামী পাবেন মোট সম্পত্তির ১/৪ (চার ভাগের এক ভাগ বা ২৫%)।


সন্তান না থাকলে: 


যদি মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান বা ছেলের সন্তান না থাকে, তবে স্বামী পাবেন মোট সম্পত্তির ১/২ (দুই ভাগের এক ভাগ বা ৫০%)।


খ |সন্তানের প্রাপ্য অংশ


সন্তানের ক্ষেত্রে মূল নিয়ম হলো "এক ছেলের অংশ = দুই মেয়ের অংশ  অর্থাৎ ছেলে ও মেয়ে যথাক্রমে 2 : 1 অনুপাত পাইবে।


শুধু ছেলে থাকলে:


অন্য সবার  ( স্বামী ও পিতামাতা নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার পর ) অবশিষ্ট পুরো সম্পত্তি এক ছেলে থাকলে সবটাই একা পাবে আবার একাধিক ছেলে থাকলে  অবশিষ্ট সম্পত্তি সকল ছেলে সমানভাবে ভাগ করে নিবে । 


শুধু এক মেয়ে থাকলে:


যদি স্ত্রীর একটি মাত্র মেয়ে সন্তান থাকে এবং কোনো ছেলে না থাকে, তবে সেই মেয়ে পাবেন মোট সম্পত্তির ১/২ (৫০%)


দুই বা ততধিক মেয়ে থাকলে (ছেলে না থাকলে):


যদি দুই বা তার বেশি মেয়ে থাকে এবং কোনো ছেলে না থাকে, তবে মেয়েরা যৌথভাবে পাবেন ২/৩ এবং সকল  কন্যা গনে তাহা সমানভাবে ভাগ করে নিবে


ছেলে ও মেয়ে উভয়ই থাকলে:


নির্দিষ্ট অংশীদারদের (স্বামী, মা, বাবা) অংশ পরিশোধ করার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে যথাক্রমে ২:১ অনুপাতে ভাগ করে  নিবে


গ | মৃত :  স্ত্রীর পিতামাতার   অংশ 


মেয়ে মারা গেলেও তাঁর বাবা-মা তাদের কন্যা বা মৃত : স্ত্রীর সম্পত্তির অংশীদার হয়।

মৃত স্ত্রীর মা:


মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান থাকলে বা একাধিক ভাই-বোন থাকলে, মা পাবেন ১/৬ (ছয় ভাগের এক ভাগ)। আবার সন্তান বা একাধিক ভাই-বোন না থাকলে, মা পাবেন ১/৩ (তিন ভাগের এক ভাগ)


মৃত স্ত্রীর বাবা :


মৃত স্ত্রীর কোন পুত্র সন্তান থাকলে বাবা পাবেন ১/৬ (ছয় ভাগের এক ভাগ)। আবার মৃত স্ত্রীর কোন পুত্র সন্তান না থাকলে ১ / ৬ + অবশিষ্টভোগী হয়  । 


৩ । একটি সহজ বাস্তব বন্টনের উদাহরণ দিয়ে বণ্টন প্রক্রিয়া দেখান হলো যে  (কে কত পাবেন?)

আমি মোড়েলগঞ্জ উপজেলার কালিবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মৃত ; রহিমা বেগমের সম্পত্তি ভাগ করতে গিয়ে দেখি তার ওয়ারিশ  থাকে,  স্বামী, দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং মা-বাবাকে রেখে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মোট সম্পত্তি ৩০০ শতক । উক্ত সম্পত্তি হইতে কোন ওয়ারিশ কতটুকু জমি পাইবে তাহা নিচে  দেখানো হলো

স্বামী :


 স্বামী বাইরে ৭৫ শতক জমি

পিতা ; 


পিতা  পাইবে ৫০ শতক জমি


মাতা : 


মাতা পাইবে ৫০ শতক জমি

এক ছেলে : 


এক ছেলেপাইবে ৫০ শতক জমি (একত্রে দুই ছেলে ১ ০০ শতক পাইবে )

এক মেয়ে :


এক মেয়ে পাইবে ২৫শতক জমি


৪। সন্তান না থাকলে স্ত্রীর সম্পত্তির মালিক কে হবেন?

যদি মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান না থাকে, তবে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম ভিন্ন হয়:

স্বামী পাবেন: 


মোট সম্পত্তির ১/২  অংশ (৫০%)।


মা পাবেন: 


মোট সম্পত্তির ১/৬  অংশ (১৬. ৬৭%)।


বাবা পাবেন:


মোট সম্পত্তির ১/৬  অংশ (১৬. ৬৭%) + অবশিষ্ট সম্পত্তি।




বিশেষ দ্রষ্টব্য: 


যদি স্ত্রীর সন্তান না থাকে এবং পিতা মাতা ও জীবিত না থাকেন, তবে স্বামী তাঁর নির্দিষ্ট ১/২ অংশ পাওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি স্ত্রীর আপন ভাই-বোন যথাক্রমে  ২ : ১ অনুপাতে ভাগ করে নিবে।


৫। স্ত্রীর দেনমোহর বা মহরানার সম্পত্তি এবং বাপের বাড়ির সম্পত্তি

বাংলাদেশে অনেক সময় দুটি বিষয় নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়:

ক ।  দেনমোহরের টাকায় কেনা বা মহরানার সম্পত্তি :


স্ত্রীকে দেনমোহর হিসেবে দেওয়া জমি বা টাকা সম্পূর্ণ স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি। মৃত্যুর পর এই সম্পত্তি সাধারণ নিয়মেই স্বামী, সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে বণ্টন হয়। স্বামী দেনমোহর দিয়েছিলেন বলেই যে তিনি মৃত্যুর পর পুরোটা ফেরত পাবেন এমন কোনো নিয়ম নাই।


খ ।  বাবার বাড়ি থেকে প্রাপ্ত বা পৈতৃক সম্পত্তি


স্ত্রী তাঁর বাবার বাড়ি থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে যে সম্পত্তি পেয়েছেন, তাও তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তাঁর মৃত্যুর পর ঐ সম্পত্তিতেও স্বামী ও সন্তানরা ইসলামিক আইন অনুযায়ী  অংশ 

পাইবে। বাবার বাড়ির সম্পত্তি কেবল বাপের বাড়ির লোকজন পাবে এ ধারণা ভুল।


৬ । বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি যে  আইন গত জটিলতা এড়াতে বাংলাদেশে যে  কাজ গুলি করতে হবে |

বাংলাদেশে স্ত্রীর সম্পত্তি আইনগতভাবে বণ্টন ও নামজারিকরার জন্য নিম্নলিখিত কাজগুলো করা দরকার  ।


ওয়ারিশ সনদ পত্র :


স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে মৃত স্ত্রীর বৈধ ওয়ারিশদের তালিকা বা ওয়ারিশ কায়েম সনদ সংগ্রহ করতে হবে।


ফারায়েজ সনদ:


স্থানীয় কাজী বা ইসলামিক স্কলারদের  বা   বিজ্ঞ দেওয়ানী আইনজীবীর  মাধ্যমে সঠিক ফারায়েজ তৈরি করে অংশ নিশ্চিত করতে হবে।


আপস-বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি :


 সকল ওয়ারিশদের সম্মতিতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে একটি আপস-বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে ।


 আইনগত পরামর্শ:


 জমিজমা বিষয়কোনো সমস্যা দেখা দিলে  অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবী বা লিগ্যাল এইড অফিসের   পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।



কিছু সাধারন জিজ্ঞাসা বা (FAQ)

কোন স্বামীর স্ত্রী মারা গেলে স্বামী কি তার স্ত্রীর  সকল সম্পত্তি পাবে?

উত্তর: না, এটি একটি সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা। সন্তান থাকলে স্বামী পাবে ১ /৪ অংশ বা ২৫% এবং সন্তান না থাকলে পাবে মোট সম্পত্তির অর্ধেক বা  ৫০% । বাকি সম্পত্তি সন্তান সহ, পিতা-মাতা ও  অন্যান্য ওয়ারিশগনের  মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে ।

স্ত্রীর পিতা-মাতার হইতে যে সম্পত্তি পেয়েছেন তা থেকে  স্বামী কী কোন সম্পত্তি পাইবে ?

উত্তর: হ্যাঁ, স্ত্রী যেভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন তা  পৈত্রিক দিক থেকে বা স্বামীর দিক থেকে হোক বা নিজের উপার্জিত হোক স্ত্রীর সকল সম্পত্তি তার মৃত্যুর পরে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সকল  ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে ।

স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় তার  নিজের সম্পত্তি কী  যাকে ইচ্ছা দান করতে পারেন?

উত্তর: হ্যাঁ, স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় সুস্থ মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবে তার সম্পত্তি তার স্বামী বা ছেলে-মেয়ে বা পিতামাতা বা ভাই-বোন এদের যে কারো নামে রেজিস্ট্রিকৃত হেবা দলিল বা দানপত্র দলিলের মাধ্যমে লিখে দিতে পারে ।

 স্ত্রীর সম্পত্তি সঠিকভাবে ভাগ বন্টনের জন্য করণীয়

স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তার সম্পত্তি সঠিকভাবে ভাগ বন্টনের জন্য মুসলিম-ফারাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ  এমন মুফতি বা এমন আলেমদের সরনাপন্ন হয়ে বা একজন অভিজ্ঞ দেওয়ানী  উকিলের পরামর্শ নিয়ে স্ত্রীর সম্পত্তি সঠিকভাবে ভাগ বন্টন করতে হবে |


Post a Comment

Previous Post Next Post