বাংলাদেশে সম্পত্তি ও জমি জমার বাজারে ওয়াকফ সম্পত্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে সাধারণ ক্রেতা বা বিক্রেতা ওয়াকফ সম্পত্তি কেনাবেচা করতে গিয়ে আইনি সমস্যায় পড়তে হয় । তাই ওয়াকফ সম্পত্তি কেনাবেচা: প্রচলিত আইন, অনুমতি ও সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে হবে এবং ওয়াকফ প্রশাসকের অনুমতি কীভাবে নিতে হয় এসব বিষয়ে ভালো ধারণা থাকতে হবে।
এই লেখায় আমরা প্রচলিত ওয়াকফ আইন, বিক্রয় বা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং ঝুঁকি এড়ানোর সঠিক পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো ।
ওয়াকফ সম্পত্তি কী এবং এর আইনি ভিত্তি?
ইসলামিক শরিয়ত ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ‘ওয়াকফ’ হলো কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার মালিকানাধীন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি চিরতরে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা, যার মাধ্যমে প্রাপ্ত আয় ধর্মের কাজে বা জনগণের কল্যাণের কাজে ব্যয় করা হয় ।
বাংলাদেশে ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ওয়াকফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২ কার্যকর রয়েছে। এই আইনের অধীনে সরকার একটি ‘ওয়াকফ প্রশাসন পরিচালনা করে, যা দেশের সকল নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তির তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করে।
ওয়াকফ সম্পত্তির প্রকার
মূলত ওয়াকফ সম্পত্তি দুই প্রকারের হয়ে থাকে:
জনকল্যাণমূলক ওয়াকফ :
যে ওয়াকফ এর সম্পত্তি সাধারণ মানুষের কল্যাণ, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা বা কবরস্থানের জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে।
পরিবারকেন্দ্রিক ওয়াকফ :
যে ওয়াকফ এর সম্পত্তি নিজের সন্তান বা বংশধরদের উপকারের জন্য জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে এবং বংশধর না থাকলে তা জনকল্যাণ ব্যয় হয় ।
ওয়াকফ সম্পত্তি কি বিক্রি বা হস্তান্তর করা যায়?
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ওয়াকফ সম্পত্তি কেনাবেচা, হস্তান্তর, বন্ধক বা দান করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
ইসলামিক শরিয়ত ও ১৯৬২ সালের ওয়াকফ আইনের নিয়ম অনুযায়ী, সম্পত্তি একবার ওয়াকফ হয়ে গেলে তার মূল স্বত্ব আর কোনো ব্যক্তির অধীনে থাকে না। তাই মোতাওয়াল্লি বা সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক বা ওয়াকফকৃত পরিবারের সদস্য হলেও কারো একার ইচ্ছায় ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন না।
ভিন্ন পরিস্থিতিতে ও বিশেষ অনুমতি
তবে আইনের কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রয় বা বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদি তা ওয়াকফ উদ্দেশ্য রক্ষা বা সম্পত্তির স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি হয়।
১৯৬২ সালের ওয়াকফ আইনের ২৮ নম্বর ধারার সংশোধনী অনুযায়ী:
ওয়াকফ প্রশাসকের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক, ইজারা বা হস্তান্তর করা হলে তা আইনগত ভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বাতিল বলে গণ্য হবে।
মোতাওয়াল্লি যদি ওয়াকফ সম্পত্তির সার্বিক উন্নয়নের জন্য (যেমন: জরাজীর্ণ সম্পত্তি বিক্রি করে নতুন কোনো লাভজনক সম্পত্তি ক্রয় করার জন্য বিক্রয় করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই ওয়াকফ প্রশাসকের কাছে যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখিয়ে অনুমতি আবেদন করতে হবে।
ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রয়ের আবেদন ও আইনি অনুমতি প্রক্রিয়া
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া না মেনে ওয়াকফ জমি কেনাবেচা করলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। তাই নিচে ওয়াকফ সম্পত্তি হস্তান্তরের সঠিক প্রক্রিয়া ধাপভিত্তিক আলোচনা করা হলো:
১ | মোতাওয়াল্লি বা পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত
প্রথমেই সম্পত্তির মোতাওয়াল্লি বা ওয়াকফ পরিচালনা কমিটিকে একটি আনুষ্ঠানিক মিটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কেন সম্পত্তিটি বিক্রি বা বিনিময় করা প্রয়োজন।
২ | ওয়াকফ প্রশাসকের কাছে আবেদন
মোতাওয়াল্লিকে ঢাকার নিউ ইস্কাটন রোডস্থ ‘ওয়াকফ প্রশাসক, বাংলাদেশ’-এর কার্যালয়ে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সাথে নিম্নলিখিত কাগজপত্র জমা দিতে হয়:
ওয়াকফ দলিলেরসত্যায়িত কপি।
ওয়াকফ জমির প্রয়োজনীয় পর্চা যেমন , সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান হতে পারেএবং নামজারি পরচা।
ওয়াকফ নিবন্ধনের প্রমাণ।
সম্পত্তি কেন বিক্রি করা দরকার তার সঠিক যুক্তি ও ব্যাখ্যা দিতে হবে।
বিক্রয় করা টাকা কীভাবে অন্য কোনো লাভজনক কাজে পুনরায় বিনিয়োগ করা হবে তার বর্ণনা।
৩ | তদন্ত ও যাচাই বাছাই
আবেদন পাওয়ার পরে ওয়াকফ প্রশাসন বিষয়টি স্থানীয় বা পরিদর্শকের মাধ্যমে তদন্ত করায়। তারা নিশ্চিত হন যে এই ওয়াকফ সম্পত্তির বিক্রয়ের কারণে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা।
৪ |গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
কাজের স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য অনেক সময় পত্রিকায় বা স্থানীয়ভাবে নোটিশ বা গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ বা ওয়ারিশদের কোনো আপত্তি থাকলে তা জানাতে পারেন।
৫ | অনুমতি বা মঞ্জুরি সনদ জারি
সকল কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হলে এবং ওয়াকফ প্রশাসক সন্তুষ্ট হলে তিনি সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য লিখিত ‘মঞ্জুরি সনদ’ প্রদান করেন।
কেনাবেচার সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই
ওয়াকফ সম্পত্তি কেনার আগে একজন সচেতন ক্রেতা হিসেবে আপনাকে অবশ্যই নিচের কাগজপত্র ও তথ্য যাচাই করতে হবে:
