মুসলিম ফারায়েজ আইন বই ২০২৬: সহজ ভাষায় ফারায়েজ শিক্ষার সেরা উপায়

 


মুসলিম ফারায়েজ আইন বই ২০২৬: সহজ ভাষায় ফারায়েজ শিক্ষার সেরা উপায়



ইসলামী জীবনে প্রতিটি ইবাদত এবং হুকুম-আহকামের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তবে ধন-সম্পদ ভাগ বণ্টন বিষয় জ্ঞান আছে, যাকে মুসলিম ফারায়েজ আইন বলা হয়, তা শিক্ষার জন্য বিশেষ তাকিদ দেওয়া হয়েছে। হাদিস শরীফে ফারায়েজকে "জ্ঞানের অর্ধেক" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে সুতরাং আমাদের মুসলিম ফারায়েজ আইন বই ২০২৬: সহজ ভাষায় ফারায়েজ শিক্ষার সেরা উপায় পছন্দ করে এ বিষয় সম্পর্কে প্রত্যেক মুসলমানকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

বর্তমান সমাজে ইসলামী নিয়মানুযায়ী সঠিক ভাবে উত্তরাধিকার ভাগ বণ্টন না করার কারণে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ,ও  মামলা হয় এবং সামাজিক সমস্যা দেখা যায়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাস্তবমুখী ও সহজ উপায়ে ফারায়েজ আইন শেখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই লেখায় আমরা আলোচনা করব মুসলিম ফারায়েজ আইনের মূল ভিত্তি, ২০২৬ সালের আধুনিক প্রেক্ষাপট এবং এই বিষয়ে সহজে শেখার সেরা উপায়।

ফারায়েজ আইন কী এবং কেন এই বিষয়ে শেখা অত্যন্ত জরুরি?

'ফারায়েজ'  শব্দটি আরবি 'ফরিযাহ' শব্দের বহুবচন, যার অর্থ নির্দিষ্ট অংশ । ইসলামী শরীয়াহ ও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তার রেখে যাওয়া স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি জীবিত ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যেভাবে ভাগ বণ্টন করার নির্দেশ রয়েছে, তার নিয়মকে  ফারায়েজ আইন বলা হয়।

ফারায়েজ শিক্ষার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গুরুত্ব

১ | আল্লাহ তাআলার নিজের আদেশ: 

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-নিসা-এর ১১, ১২ এবং ১৭৬ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকার ভাগ বণ্টনের সঠিক গাণিত  ভিত্তিক ও আইনি কাঠামো আল্লাহ তাআলা নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

 ২ | হাদিসের তাকিদ:

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ( সঃ ) বলেছেন, "তোমরা মুসলিম ফারায়েজ বা মিরাস বিষয় জ্ঞান অর্জন করো এবং মানুষকে তা শেখাও। কারণ এটি জ্ঞানের অর্ধেক এবং এটি ভুলে যাওয়া সহজ।" (ইবনে মাজাহ)।

 ৩ | অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জুলুম রোধ: 

মৃত :  ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনে ভুল হলে কোনো কোনো ওয়ারিশ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, যা ইসলামী আইন মতে বড় ধরনের কবিরা গুনাহ ও  জুলুম করা হয়।

 ৪ | পারিবারিক শৃঙ্খলা:

মুসলিম আইনগত উপায়ে ফারায়েজ অনুসরণ করে  ভাই-বোনের মধ্যে বা আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে জমিজমা বিষয়ে সমস্যা  চির দিনের জন্য দূর হয়।

মুসলিম ফারায়েজ আইনের মূল নিয়ম ও শর্তাবলী :

সম্পদ ভাগ বণ্টনের মূল ধাপে যাওয়ার আগে ফারায়েজ আইনের কয়েকটি প্রাথমিক  নিয়ম ও শর্ত ভালোভাবে জানা দরকার ।

মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের পূর্ব অবশ্য করনীয় চারটি কাজ :

কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে ওয়ারিশদের অংশ দেওয়া  আগে পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে  ।

 ১ । দাফন-কাফনের খরচ:

মৃত ব্যক্তির নিজের রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে  দাফন-কাফনের যাবতীয় ব্যয় করতে হবে ।

২ । ঋণ পরিশোধ:

যদি  মৃত ব্যক্তি কোনো দেনা বা ঋণ থাকে  এবং স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর বকেয়া থাকে তবে  তা পরিশোধ করতে হবে। 

৩ । ওসিয়ত পূরণ:

মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে কারোর উদ্দেশ্যে কোনো ওসিয়ত  করে গেলে, তা পূরণ করতে হবে ।ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদের সর্বোচ্চ ১ / ৩   অংশ থেকে তা পূরণ করতে হবে। 

৪ । অবশিষ্ট সম্পদ বণ্টন:

উপরের ৩টি কাজ শেষ করার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, তা ফারায়েজ আইন অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে দিতে হবে । 

ওয়ারিশদের শ্রেণীবিভাগ: কোন শ্রেণীর ওয়ারিশগণ কতটুকু পাইবে?

মুসলিম ফারায়েজ আইনে ওয়ারিশদের মূলত তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে:

                          

১ । জাবিল ফুরুজ ( নির্দিষ্ট অংশীদার )

এদের অংশের পরিমাণ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন  (যেমন: ১/২, ১/৪, ১/৮, ২/৩, ১/৩, ১/৬)। কুরআনে মোট ১২ জন ব্যক্তির নির্ধারিত অংশের কথা বলা হয়েছে (৪ জন পুরুষ এবং ৮ জন নারী):

স্বামী ও স্ত্রী:

সন্তান থাকলে স্ত্রীর পাবে ১/৮  অংশ এবং স্বামীর পাবে ১/৪ অংশ ।  সন্তান না থাকলে স্ত্রীর পাবে ১/৪ অংশএবং স্বামীর পাবে ১/২ অংশ । 

পিতা ও মাতা:

সন্তান থাকলে পিতা ও মাতা উভয়েই ১/৬ করে পান।

কন্যা:

এক কন্যা হলে একাই অর্ধেক পাইবে ,, একাধিক কন্যা হলে ২/৩ অংশ পাইবে এবং সকল কন্যাকানে তাহা সমানভাবে ভাগ করে নিবে। (ছেলে থাকলে কন্যা  অবশিষ্টভোগী হয়ে যায়)।

২ । আসাবাহ ( বা অবশিষ্টভোগী)

জাবিল ফুরুজের নির্দিষ্ট অংশ বণ্টনের পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে, তা আসাবাহ বা অবশিষ্ট  ভুগিরা পাইবে।

ছেলে  : 

 ফারায়েজ আইনের সবচেয়ে শক্তিশালী আসাবাহ /  অবশিষ্ট  ভুগি ছেলে থাকলে কন্যাও অবশিষ্ট  ভুগি  হিসেবে অংশ পায় । ছেলে ও মেয়ে যথাক্রমে ২ : ১  অনুপাতে পাইবে । 

৩ ।  জাবিল আরহাম  বা দূরবর্তী আত্মীয়)

যদি জাবিল ফুরুজ ও অবশিষ্ট  ভুগি শ্রেণীর কোনো ওয়ারিশ জীবিত না থাকে, তবে রক্তসম্পর্কীয় অন্যান্য দূরবর্তী আত্মীয়রা  সম্পত্তি পান।

২০২৬ সালে সহজ ভাষায় ফারায়েজ শিক্ষার সেরা উপায়  ।

স্বাভাবিকভাবে কঠিন গাণিত ভিত্তিক নিয়ম এর  কারণে মুসলমানদের ফারায়েজ অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে কঠিন ও জটিল মনে হয়। তবে ২০২৬ সালের আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ও সহজ শিক্ষার কারণে ফারায়েজ শেখা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।

                  ২০২৬ সালে ফারায়েজ শিক্ষার সেরা মাধ্যম
                                    

১ । আধুনিক জ্ঞান সমৃদ্ধ বই  পড়া  ।

জটিল বইগুলোর বদলে বর্তমানে আধুনিক এবং উদাহরণ ভিত্তিক ফারায়েজ বই পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের আধুনিক বইগুলোতে বাস্তব জীবনের  মামলার উদাহরণ দেওয়া থাকে, যা বুঝতে সাহায্য করে।

২ ।  ডিজিটাল ফারায়েজ ক্যালকুলেটর ও অ্যাপস ব্যবহার ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের 'অনলাইনে  ফারায়েজ ক্যালকুলেটর' (farayez.gov.bd) এবং বিভিন্ন মোবাইল ব্যবহার করে খুব সহজেই ওয়ারিশদের সংখ্যা বসিয়ে শতক ও অংশের হিসাব বের করা যায়। এটি শেখার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মাধ্যম । 

৩ । সাধারণ গাণিতিক অনুপাত  (১:২ নীতি) বোঝা ।

মুসলিম ফারায়েজ গাণিতিকভাবে অত্যন্ত নিখুঁত। পবিত্র কুরআন অনুযায়ী সাধারণত "এক ছেলের অংশ = দুই মেয়ের অংশ"। অর্থাৎ, কোনো পিতা মারা গেলে ছেলে ভাই হিসেবে বোনের প্রাপ্ত অংশের দ্বিগুণ পাবে, কারণ পরিবারে অর্থনৈতিক ও ভরণপোষণের সামাজিক  দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পিত হয়।

৪ ।  বাস্তব বন্টনের অভিজ্ঞতার  মাধ্যমে শেখা 

আমি মোড়েলগঞ্জ  থানার আওতাধীন সোনাতলা  গ্রামের এক লোক আব্দুল হাকিম এর বাড়িতে যাই এবং মুসলিম জমি জমা বিষয়ক আইন ফারায়েজ  মোতাবেক জমি জমা  ভাগ করতে গিয়ে দেখি আব্দুল হাকীর এর মৃত্যু আনতে ২০০ শতক জমি বা  সার্ভে বিগার ৬ বিঘা জমি রেখে যায়। তাতে আব্দুল হাকিমের ওয়ারিশ কায়েম সনদ অনুযায়ী ওয়ারিশ থাকে এক স্ত্রী , তিন মেয়ে। দুই ছেলে উক্ত সম্পত্তি হইতে কে কতটুকু জমি পাইবে?

 এক স্ত্রী পাইবে :

মুসলিম ফরাজ মোতাবেক মোট সম্পত্তির ১ /৮ অংশে এক স্ত্রী পাইবে ২৫ শতক   ।

প্রত্যেক মেয়ে পাইবে : 

মুসলিম ফরাজ মোতাবেক মোট সম্পত্তির থেকে এক  মেয়ে পাইবে  ২৫ শতক    ( একত্রে তিন মেয়ে পাইবে ৭৫ শত ) | 


প্রত্যেক ছেলে পাইবে : 

মুসলিম ফরাজ মোতাবেক মোট সম্পত্তির থেকে এক ছেলে পাইবে  ৫০ শতক    ( একত্রে দুই ছেলে পাইবে ১০০ শতক )     

মুসলিম আইন মোতাবেক সম্পত্তিতে প্রত্যেক ওয়ারিশের অংশ নির্ধারণ করে একজন বিজ্ঞ সার্ভেয়ার দিয়ে সরজমিনে জমি মাপিয়ে কে কোন খতিয়ানের কোন দাগ হইতে জমি নিবে তা নির্ধারণ করে দেই এবং ওয়ারিশদের আরও পরামর্শ দেই যে এই ভাগ অনুযায়ী তোমরা সকলে মিলে  আপোষ বন্টন দলিল রেজিস্ট্রি করবা এবং নিজের  নামে নাম পত্তন করে নিজের  নামে সরকারি খাজনা দেবা  । 

বিশেষ লক্ষণীয় : 

মুসলিম ফারায়েজ  অনুযায়ী  জমি জমা ভাগ করতে হলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে ভাগ করবেন ।

ইসলামী ফারায়েজ আইন বনাম বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এর একটি আইনি দৃষ্টিভঙ্গি ।

 ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন : 

 ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ফারায়েজ আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করা হয়েছে, যা  এই আইনের -৪ ধারায় প্রতিনিধি আইন স্বীকৃতি বলে পূর্ব মৃত : সন্তানের সন্তানদের অধিকার নিশ্চিত করে  ।

প্রথাগত শরীয়াহ আইন: 

পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় পিতা পূর্বে যদি ছেলে মারা যায়, তবে পিতার মৃত্যুর পর নাতি-নাতনিরা প্রথাগত আসাবাহ নীতি অনুযায়ী নাতিরা দাদার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতো ।

বাংলাদেশের চলমান ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন  । 

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তান ছেলে বা মেয়ে যেই হোক পিতার আগে মারা গেলে ঐ  সন্তানের ছেলে ও মেয়েরা  বা দাদার নাতি-নাতনিরা  বা নানার দৌহিত্র এরা দাদা বা নানা জমি জমা থেকে ততটুকু সম্পত্তি পাইবে যতটুকু সম্পত্তি তাদের বাবা / মা বেঁচে থাকলে পাইত । 



Post a Comment

Previous Post Next Post