হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ও সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থা: যা জানা আবশ্যক








হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ও সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থা: যা জানা আবশ্যক


বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বণ্টন প্রক্রিয়া মূলত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা প্রথাগত আইন এবং ধর্মীয় শাস্ত্রীয় মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আধুনিক আইনি ব্যবস্থায় সাধারণ নাগরিক আইনের অনেক বিস্তার ঘটলেও, পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন বা উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ায় হিন্দু দেওয়ানি আইন  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনি যদি একজন পরিবারের সদস্য হিসেবে নিজের প্রাপ্য অধিকার জানতে চান কিংবা জটিল সম্পত্তি বণ্টন প্রক্রিয়ার সঠিক দিশা খুঁজছেন, তবে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ও সম্পত্তি বণ্টন ব্যবস্থা: যা জানা আবশ্যক |


এই লেখায় আমরা হিন্দু সম্পত্তি উত্তরাধিকার আইনের মূল নীতি, বিভিন্ন স্কুল বা মতবাদ, নারী অধিকার, উইল  ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া এবং এর জটিলতাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।



১ | হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের মূল ভিত্তি ও প্রধান মতবাদসমূহ


হিন্দু আইন কোনো একটি  ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়। ঐতিহ্যগতভাবে এটি দুটি প্রধান মতবাদ বা স্কুলের ওপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রিত হয়:


ক |  দায়ভাগ 


বাংলাদেশে প্রধানত দায়ভাগ মতবাদ অনুসরণ করা হয়। এই মতবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

জীবদ্দশায় অর্জিত সম্পত্তি:


বাবা জীবিত  থাকা অবস্থায় সন্তানরা পিতার সম্পত্তিতে কোনো  অধিকার পায় না।


মৃত্যুর পর অধিকার :


পিতা বা সম্পত্তির মূল মালিকের মৃত্যুর পরই কেবল উত্তরাধিকারীদের   জমি জমায় অধিকার জন্মায় ।


সম্পত্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ:


মূল মালিক জীবিত থাকা অবস্থায় নিজের ইচ্ছামতো সম্পত্তি বিক্রি, দান বা উইল করতে পারেন।


খ |  মিতাক্ষরা 

ভারত ও নেপালের অধিকাংশ অঞ্চলে মিতাক্ষরা মতবাদ প্রচলিত। এর মূল বৈশিষ্ট্য:

জন্মগত অধিকার:


সন্তান জন্মগ্রহণের সাথে সাথেই পিতার যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে সন্তানের ও  অধিকার জন্মায় ।

যৌথ মালিকানা:


উত্তরাধিকারীদের অধিকার মৃত্যুর আগে থেকেই নির্ধারিত হতে থাকে।


২ । হিন্দু আইনে সম্পত্তি বণ্টনের শ্রেণিবিভাগ

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে যেকোনো সম্পত্তি প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত করে বণ্টন বিচার করা হয়:

  অর্জিত সম্পত্তি : 


কোনো ব্যক্তি যদি নিজের  ব্যবসা বা নিজস্ব দক্ষতায় সম্পত্তি অর্জন করেন, তবে তাকে 
অর্জিত সম্পত্তি বলা হয়।



মালিক তাঁর জীবদ্দশায় এই সম্পত্তি যাকে ইচ্ছা দান, বিক্রয় বা উইল করে দিয়ে যেতে পারেন।


কোনো উইল না করে মারা গেলে  দায়ভাগ আইন অনুসারে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হয়।

 পৈতৃক বা যৌথ সম্পত্তি 


যে সম্পত্তি পূর্বপুরুষদের (যেমন: পিতা, পিতামহ বা প্রপিতামহ) কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছে, তা পৈতৃক সম্পত্তি। দায়ভাগ আইনে মালিকের মৃত্যুর পর এই সম্পত্তি তাঁর প্রাথমিক ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হয়।


৩ । দায়ভাগ আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী নির্বাচন ও শ্রেণিবিভাগ  :


দায়ভাগ মতবাদে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘পিন্ডদান’ বা ধর্মীয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করার যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্য পিন্ডদানে বেশি অগ্রাধিকার পান, তিনি সম্পত্তিতেও অগ্রগণ্য হিসেবে অধিকার লাভ করবেন। উত্তরাধিকারীদের প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:


 সপিণ্ড 


যারা মৃত ব্যক্তির সরাসরি রক্তের সম্পর্কের এবং পিন্ডদানের অধিকার রাখেন। এরা সবার আগে ধিকার  পয় ।


যেমন,

 পুত্র, পৌত্র (নাতি), প্রপৌত্র (পুত্রের নাতি), বিধবা স্ত্রী, কন্যা (নির্দিষ্ট শর্তে) এবং পিতা-মাতা।


 সকুল্যা 


সপিণ্ড শ্রেণির কোনো ওয়ারিশ না থাকলে সকুল্যা শ্রেণির দূরবর্তী রক্তের আত্মীয়রা সম্পত্তিতে অধিকার পান।


  সমানোদক 


উপরে উল্লিখিত দুই শ্রেণির  ওয়ারিশ কেউ না থাকলে দূরবর্তী জ্ঞাতিরা সমানোদক হিসেবে সম্পত্তির দাবি করতে পারেন।


৪ ।  হিন্দু আইনে নারীদের সম্পত্তির অধিকার ও  বর্তমান বাস্তবে  কী অবস্থা?


হিন্দু পারিবারিক আইনে নারীদের সম্পত্তির অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়। প্রথাগত দায়ভাগ আইন অনুসারে নারীদের অধিকার সীমিত হলেও আধুনিক আইনি সংস্কারের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন হয়েছে।


ক । বিধবা স্ত্রীর অধিকার


এক পুত্রের সমপরিমাণ সম্পত্তি :


স্বামীর মৃত্যুর পর যদি পুত্র সন্তান থাকে, তবে বিধবা স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে  এক ছেলের সমপরিমাণ সম্পত্তি জীবনী স্বত্ব  হিসেবে পাইবে  ।


সম্পত্তি বেচাকেনা করিতে পারিবে না :


স্ত্রী এই জমি বেচতে পারিবে না  শুধুমাত্র   ভোগ করতে পারেন।


স্ত্রী মারা গেলে ঐ সম্পত্তি  :


স্ত্রী মারা গেলে ঐ সম্পত্তিপুনরায় স্বামীর নিজ গোত্রের ওয়ারিশদের কাছে ফিরে যায়।



১৯৩৭ সালের হিন্দু বিধবা নারীদের সম্পত্তির অধিকার সংরক্ষণ আইন  : 


  এই আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন বিধবা স্ত্রী তাঁর মৃত স্বামীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিতে পুত্রের সমান অংশ পাওয়ার অধিকার রাখেন  জীবনস্বত্ব হিসেবে।


খ |  কন্যার সম্পত্তির অধিকার


দায়ভাগ আইনে সকল কন্যা সমানভাবে বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না। সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে:


১ ।পুত্রসন্তান আছে এমন কন্যা বা পুত্রসন্তানের সম্ভাবনা রয়েছে এমন বিবাহিত কন্যা: 


 পুত্রসন্তান আছে এমন কন্যা বা পুত্রসন্তানের সম্ভাবনা রয়েছে এমন বিবাহিত কন্যারা অগ্রাধিকার পায় ।


২ । অবিবাহিত কন্যা: 


পুত্রসন্তান আছে এমন কন্যার  অনুপস্থিতিতে অবিবাহিত কন্যা অধিকার পান।


৩ । সন্তানহীন বিধবা বা বন্ধ্যা কন্যা:


 সাধারণ দায়ভাগ আইনে সন্তানহীন বিধবা বা বন্ধ্যা কন্যারা পিতার সম্পত্তি হইতে থেকে বঞ্চিত হন।

 

আইনি দ্রষ্টব্য:

 

বাংলাদেশে ২০১২ সালে ‘হিন্দু পারিবারিক বিবাহ নিবন্ধকরণ আইন’ এবং পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনগত সংস্কার আনা হলেও, কন্যাসন্তানকে   সমান উত্তরাধিকার ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু আইনগত সমস্যা আছে।


৫ । উইল  দানপত্র দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি বণ্টন : 


যেহেতু প্রচলিত আইনে কিছু ক্ষেত্রে আইন গত ওয়ারিশরা বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তাই বর্তমানে অনেকেই উইল বা হেবা/দানপত্র দলিল করার দিকে ঝুঁকছেন।

রেজিস্টিকৃত উইল দলিল :


 কোনো হিন্দু ব্যক্তি তাঁর নিজের সম্পত্তি মৃত্যুর পূর্বে যেকোনো ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি কৃত উইল দলিল করে যেতে পারেন। প্রদ্যোত কুমার বনাম রাজলক্ষ্মী মামলার নজির অনুসারে, উইল কার্যকর করতে হলে টেস্টেটর (উইলকারী) মৃত্যুর পর আদালত থেকে প্রোবেট   সংগ্রহ করাতে  হবে । 


রেজিস্টিকৃত দানপত্র দলিল  :


  জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির  সম্পূর্ণ অধিকার হস্তান্তর করার সহজ পথ হলো  দানপত্র দলিল । এটি রেজিস্টিকৃত  হতে হবে এবংরেজিস্টির  পরে তাৎক্ষণিকভাবে মালিকানা  পরিবর্তন হবে ।





৬ ।  সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সাধারণ ভুল ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে আইন গত  পরামর্শ দিচ্ছি  :


আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও একজন অভিজ্ঞ দেওয়ানি    আইনজীবীর দৃষ্টিতে, হিন্দু সম্পত্তি বণ্টনের সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে সচেতন থাকা জরুরি:


উত্তরাধিকার সনদের অভাব:


পরিবারের প্রধান পিতার মৃত্যুর পর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে স্মারক সম্বলিত ওয়ারিশান সনদ পত্র সংগ্রহ করতে  হবে ।


নামজারি ও মিউটেশন :


সম্পত্তি পাওয়ার পরে সম্পত্তি যে এলাকায় ঐ এলাকার স্থানীয় থানা বা উপজেলা এসিল্যান্ড অফিস গিয়ে নামজারি করতে হবে । কেবল   সম্পত্তি দখল বজায় রাখলে পরবর্তীতে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

প্রোবেট  করা:



উইল থাকার পরও যদি আদালতের মাধ্যমে তা প্রোবেট করা না হয়, তবে হস্তান্তরিত সম্পত্তি নামজারি বা বিক্রি করা  জটিল হয়। তাই সম্পত্তিতে উইল থাকলে তা  প্রোবেট করতে হবে । 



বাটোয়ারা মামলা :


রেজিস্ট্রিকৃত আপোষ বন্টন দলিল করতে অংশীদাররা রাজি না  হলে, দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা বা বণ্টন মামলা দায়ের করে নিজের অংশ চিহ্নিত করে নিতে  হবে ।

শেষ কথা  : 

আসলেই হিন্দু উত্তরাধিকার আইন একটি জটিল  বিষয়। তাই প্রাচীন ধর্মীয় দায়ভাগ আইন এবং আধুনিক দেওয়ানি ব্যবস্থার সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায়, হিন্দুসম্পত্তি বণ্টন আইনের সূক্ষ্ম দিকগুলো খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পরিবারে নারী, বিধবা স্ত্রী ও কন্যাদের  অধিকার নিশ্চিতকরলে   এবং উইল বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সঠিক আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভবিষ্যৎ পারিবারিক সমস্যা সহজেই এড়ানো সম্ভব।

তাই আপনার সম্পত্তির ভাগ বন্টন ঝামেলামুক্ত ও আইনসম্মত ভাবে করতে হলে সব সময় একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক ও দেওয়ানি আইন বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে  ।


Post a Comment

Previous Post Next Post