স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার কতটুকু? হিন্দু আইন ২০২৬




স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার কতটুকু? হিন্দু আইন ২০২৬







বর্তমানে বাঙালি হিন্দু পরিবারে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে নানা প্রশ্ন, ভুল ধারণা ও আইন গত সমস্যা দেখা দেয় । বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে হিন্দু দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা আইন এবং বর্তমানে এই  আইনের  সংস্কারের ফলে  অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন এসেছে তাই আমাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার কতটুকু? হিন্দু আইন ২০২৬ সম্পর্কে ।

এই লেখায় আমরা ২০২৬ সালের  প্রচলিত আইন, উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় এবং ঐতিহাসিক আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে স্বামীর মৃত্যুর পর একজন হিন্দু বিধবা স্ত্রী কতটুকু সম্পত্তির মালিক হবেন এবং তাঁর কী কী অধিকার রয়েছে, এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১ | হিন্দু আইনে  উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি: দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা

হিন্দু উত্তরাধিকার আইন প্রধানত দুই  ভাগে  বিভক্ত:

দায়ভাগ (Dayabhaga) আইন: 



এই দায়ভাগ  আইন  মূলত বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে প্রযোজ্য। এই আইনে স্বামীর অর্জিত ও পৈতৃক উভয় সম্পত্তির ওপর বিধবা স্ত্রীর নির্দিষ্ট আইন গত অধিকার আছে।


মিতাক্ষরা (Mitakshara) আইন: 


এটি ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই আইনে যৌথ পরিবারের সম্পত্তিতে স্বামীর অধিকার অনুযায়ী স্ত্রীর অংশ নির্ধারিত হয়।


২| স্বামীর সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রীর অধিকার কতটুকু?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে মূলত দায়ভাগ  নীতি অনুসরণ করা হয় স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:

ক) সন্তান থাকলে (পুত্র বা কন্যাসন্তান বর্তমান)


যদি মৃত স্বামীর সন্তান (পুত্র বা কন্যা) থাকে, তবে বিধবা স্ত্রী ১ জন পুত্রের সমান অংশ পাবেন।

উদাহরণ: কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর যদি তাঁর এক স্ত্রী এবং ২ জন পুত্র সন্তান থাকে, তবে সম্পত্তি মোট ৩ ভাগে ভাগ হবে। স্ত্রী পাবেন ১ ভাগ, এবংএক পুত্র পাবেন ১ ভাগ করে দুই পুত্র পাবেন দুই ভাগ।


খ | কোনো সন্তান না থাকলে


যদি মৃত স্বামীর কোনো সন্তান (পুত্র বা কন্যা) না থাকে, তবে স্ত্রী স্বামীর সম্পূর্ণ সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে ভোগদখলের অধিকার পাবেন। এক্ষেত্রে শাশুড়ি বা দেবর-ভাসুর সম্পত্তির মূল মালিকানা দাবি করতে পারেন না।


৩ | হিন্দু স্ত্রী উত্তরাধিকার আইন ১৯৩৭ (Hindu Women's Rights to Property Act 1937)

বাঙালী হিন্দু সমাজে বিধবা নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৩৭ সালের আইনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


সমান অংশ লাভ:


এই আইন অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর অর্জিত ও যৌথ পরিবারের সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রী তাঁর মৃত স্বামীর স্থলাভিষিক্ত হন এবং মৃত ব্যক্তির জীবিত এক পুত্রের সমান অংশ লাভ করেন।



সীমিত সত্ত্ব :


১৯৩৭ সালের আইন অনুযায়ী বিধবা স্ত্রী যে পরিমাণ সম্পত্তি পান, তা সাধারণত "সীমিত সত্ত্ব" হিসেবে গণ্য হয় । অর্থাৎ, তিনি আজীবন ঐ সম্পত্তি ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার পাবেন, কিন্তু বিক্রি বা হস্তান্তর করার পূর্ণ অধিকার পায়  না।


উচ্চ আদালতের রায় ও বর্তমান অবস্থান:

বর্তমান  বছরগুলোতে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন  রায়ে হিন্দু নারীদের কৃষি ও অকৃষি উভয় সম্পত্তিতে সমান অধিকার প্রদান এবং তাদের আইনি গত সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে।


৪ |  কৃষি ও অকৃষি সম্পত্তিতে অধিকার

অতীতে কৃষি সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার নিয়ে আইনি অস্পষ্টতা ছিল। তবে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের  রায়ের পর এই অস্পষ্টতা দূর হয়েছে:


 অকৃষি সম্পত্তি :


 অকৃষি সম্পত্তি যেমন বাড়ি প্লট ইত্যাদি এই সম্পত্তিতেও একজন এক পুত্র সন্তান যে পরিমাণ সম্পত্তি পাইবে তার সমপরিমাণ সম্পত্তি বিধবা  স্ত্রী পাইবে । 


কৃষিজ সম্পত্তি :


চাষযোগ্য সম্পত্তি এই সম্পত্তিতেও  সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী সমানাধিকার পাওয়ার যোগ্য অর্থাৎ একজন পুত্র যে পরিমাণ সম্পত্তি পাইবে তার সমপরিমাণ সম্পত্তি বিধবা স্ত্রী পাইবে । 



৫ |  স্বামীর সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তরের নিয়ম

হিন্দু আইনে একজন বিধবা নারী তাঁর স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি চাইলেই বিক্রি করতে পারেন না। তবে কিছু  শর্তে তিনি তা  হস্তান্তর করতে পারেন:

১ । আইনি প্রয়োজন (Legal Necessity):


যদি জীবনধারণের জন্য অন্য কোনো আয়ের পথ না থাকে, চিকিৎসা খরচ মেটাতে হয়, বা ঋণ পরিশোধ করতে হয়।


২ । ধর্মীয় বা সামাজিক দায়বদ্ধতা:


মৃত স্বামীর শ্রাদ্ধ কাজ সম্পাদনের খরচের জন্য।


৩ ।  নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ:


সন্তান থাকলে তাদের লালন-পালন ও শিক্ষার খরচের প্রয়োজনে।


৬ । পুনর্বিবাহ করলে কি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে?

হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন অনুযায়ী:

যদি কোনো হিন্দু বিধবা নারী পুনরায় বিবাহ করে , তবে মৃত প্রথম স্বামীর সম্পত্তি থেকে পাওয়া তাহার  সকল অধিকার  বাতিল হয়ে যায়।

পুনরায় বিবাহের পর ঐ  সম্পত্তি প্রথম স্বামীর নিজ গোত্রের উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যায়।

৭ ।  একাধিক স্ত্রী থাকলে সম্পত্তি বণ্টন কীভাবে হয়?

যদি কোনো হিন্দু ব্যক্তির একাধিক জীবিত স্ত্রী থাকে এবং তিনি মারা যান:


একাধিক স্ত্রী মিলে এক জন পুত্রের অংশের সমান অংশ পাবেন।

অর্থাৎ, যদি ১ জন পুত্র এবং ২ জন স্ত্রী থাকেন, তবে মোট সম্পত্তি ২টি ভাগে ভাগ হবে। পুত্র পাবেন ১ ভাগ, আর বাকি ১ ভাগ দুই স্ত্রী সমান ভাগে (অর্ধেক অর্ধেক) ভাগ করে নেবেন।



৮ ।  অর্জিত সম্পত্তি বনাম পৈতৃক সম্পত্তি


 অর্জিত সম্পত্তি  :


স্বামী যদি জীবিত অবস্থায় রেজিস্ট্রি কৃত উইল দলিল না করে মারা যান, তবে তাঁর অর্জিত সম্পত্তিতে স্ত্রী আইনি অধিকার পাবেন। স্বামী উইল করে গেলে উইলের নির্দেশ অনুযায়ী বণ্টন হবে।


পৈতৃক সম্পত্তি :  


পৈতৃক সম্পত্তিতেও মৃত স্বামীর যতটুকু আইনি অংশ আছে, স্ত্রী তাঁর সমপরিমাণ অংশ ই  পাইবে।


৯ ।  আইনি জটিলতা এড়াতে বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিত্তিক করণীয় কাজ বা বিশেষজ্ঞ দের পরামর্শ


স্বামীর মৃত্যুর পরে  সম্পত্তিতে একজন বিধবা স্ত্রীর নিজের আইন গত  অধিকার নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত কাজগুলো করা অত্যন্ত জরুরি:

ওয়ারিশ সনদের আবেদন:


স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে মৃত স্বামীর  ওয়ারিশ সনদ (Succession Certificate) সংগ্রহ করতে হবে।

নামজারি ও মিউটেশন: 


স্বামীর মৃত্যুর পর জমি  যে  উপজেলায় ঐ  উপজেলার ভূমি অফিসে (AC Land Office) গিয়ে নিজের  নাম পত্তন  খতিয়ান করতে হবে।

আইনি পরামর্শ:


কোনো অংশীদার বা আত্মীয় বিধবা স্ত্রীর কে  অধিকার দিতে অস্বীকার করলে জেলা জজ কোর্টের অভিজ্ঞ  হিন্দু আইন বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে হবে ।


Post a Comment

Previous Post Next Post