আমাদের মৃত পূর্বপুরুষ ব্যক্তিগণের রেখে যাওয়া সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার ভাগ বণ্টনের নিয়ম যেকোনো পরিবারের জন্যই একটি সংবেদনশীল এবং আইনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সঠিক ভাবে ভাগ বন্টন করা অত্যন্ত জরুরি। তাই বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালে উত্তরাধিকার ও দলিল সংক্রান্ত আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় কিছু আধুনিকীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন করেছে, যা ওয়ারিশ সম্পদ ভাগ বণ্টনের প্রক্রিয়াকে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করেছে। আর এজন্য আমাদেরকে ওয়ারিশ সম্পদ বণ্টন আইন ২০২৩: মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টনের সঠিক ও আইনি উপায় সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখতে হবে ।
এই লেখায় আমরা ওয়ারিশ সম্পদ বন্টনের প্রাথমিক ধাপ, ইসলামী উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ), হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় আইন, নতুন ভূমি আইন এবং কীভাবে কোনো ভুল বা ঝামেলা ছাড়াই সম্পত্তি বন্টন করা যায় এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১ | ওয়ারিশ সম্পদ কী এবং কেন এই ওয়ারিশ সম্পদ বণ্টন প্রয়োজন?
কোন মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পত্তি তার আইন গত বা ধর্মীয় ওয়ারিশদেরমধ্যে বন্টন করার আইনি নিয়মকেই ওয়ারিশ সম্পদ বণ্টন বলা হয়।
কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পদের মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়ারিশদের ওপর বর্তায়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মালিকানা নিজের নামে স্থানান্তর করতে হলে অনলাইনে আবেদন করে এসিল্যান্ড অফিসের মাধ্যমে নিজ নামে মিউটেশন করতে হবে । মিউটেশন না করা পর্যন্ত উক্ত সম্পত্তি বিক্রয়, হস্তান্তর বা ব্যবহারের অধিকার প্রয়োগ ক্ষেত্রে নানা ধরনের আইনি বাধা দেখা দেয় ।
সঠিক নিয়মে ভাগ বণ্টনের সুফল:
পারিবারিক বিরোধ রোধ:
পরিবারের সকলওয়ারিশদের মধ্যে অস্পষ্টতা দূর হয় এবং পারিবারিক মামলা-মোকাদ্দমা এড়িয়ে থাকা যায়।
প্রত্যেক ওয়ারিশের আইনগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা:
প্রতিটি মুসলিম পারিবারিক সম্পত্তিতে প্রত্যেক ওয়ারিশের নিজের ভাগের অংশের ওপর স্পষ্ট আইনি মালিকানা তৈরি হয়।
জমি কেনাবেচা ও হস্তান্তর সুবিধা:
প্রত্যেক ওয়ারিশের নিজ নামে নামজারি খতিয়ান না থাকলে জমি বিক্রি বা দান করা যায় না।
২ । সম্পত্তি বন্টনের পূর্বে অবশ্যই করণীয় ৪টি আইনি কাজ :
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের পূর্বে কয়েকটি মৌলিক আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা দরকার। মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে সরাসরি বন্টনে যাওয়ার আগে নিচে বর্ণিত কাজগুলো সম্পন্ন করা দরকার :
দাফন-কাফন ও সৎকার খরচ:
কোন মৃত ব্যক্তির দাফন বা সৎকারের প্রয়োজনীয় ও স্বাভাবিক খরচ মূলত তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে করতে হবে।
ঋণ পরিশোধ:
কোন মৃত ব্যক্তি যদি জীবিত থাকা অবস্থায় দেনা বা ঋণ রেখে মারা যান, তবে সমস্ত ওয়ারিশদের সম্মতিতে সর্বপ্রথমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি হইতে দেনা বা ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
স্ত্রী বা স্বামীর বকেয়া দেনমোহর:
কোন মুসলমান ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় তার স্ত্রীর দেনমোহর এর টাকা পরিশোধ করে না যায় তবে স্ত্রীর দেনমোহ মুসলিম আইন অনুযায়ী ঋণ হিসেবে গণ্য হইবে আর মৃত্যু ব্যক্তির সম্পত্তি হইতে ঐ স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে
ওসিয়ত পূরণ করা :
মৃত ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় যদি কোন ওসিয়াত করে থাকে তবে তাহা তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পূরণ করতে হবে তবে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির ১ /৩ অংশের বেশি ও আছিয়াত হতে পারবে না হলেও অন্যান্য ওয়ারিশদেরউক্ত ওসিয়াতের প্রতি সমর্থন থাকতে হবে ।
৩ | ধর্মীয় আইন অনুযায়ী সম্পদ বণ্টনের নিয়ম
আমাদের বাংলাদেশের কোন ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তার উত্তরাধিকার আইন নির্ধারিত হয়। নিচে প্র ধ।ন ধর্মের আইন নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো :
ক | মুসলিম ফারায়েজ ও ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী ইসলামী উত্তরাধিকারী আইনে সম্পত্তি বন্টন :
আমাদের দেশে মুসলিম সমাজে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক এবং মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইন শরীয়ত প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭’ অনুযায়ী মূল ওয়ারিশদের নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে:
স্ত্রী/স্বামী:
কোন দম্পতির স্বামী মারা গেলে তার স্ত্রী সন্তান থাকলে পাবে ১/৮ অংশ; সন্তান না থাকলে অর্থাৎ নিঃসন্তানি দাম্পত্তি হলে পাবেন ১/৪ অংশ।
কোন দম্পতির স্ত্রী মারা গেলে তার স্বামী সন্তান থাকলে পাবে ১/৪ অংশ; আবার নি: সন্তানি দম্পতির বা সন্তান না থাকলে পাবেন ১/২ অংশ।
পুত্র ও কন্যা:
কোন দম্পতির পুত্র ও কন্যা উভয়ই থাকলে, পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পাইবে অর্থাৎ পুত্র ও কন্যা যথাক্রমে ২:১ অনুপাতে অংশ পাইবে।
কোন পিতা-মাতার পুত্র সন্তান না থাকিলে শুধুমাত্র একজন কন্যা থাকলে ঐ এক কন্যা মোট সম্পত্তির অর্ধেক একাই পাইবে । আবার একের অধিক কন্যা হইলে মোট সম্পত্তির ৩ / ২ অংশ পাইবে এবং সকল কন্যাগণে তাহার সমানভাবে ভাগ করে নিবে ।
বাবা-মা:
মাতা মোট সম্পত্তির ১ / ৬ অংশ পাইবে ।
বাবা মোট সম্পত্তির ১ / ৬ অংশ পাইবে অর্থাৎ পুত্র সন্তান না থাকিলে পিতা পাইবে ১ / ৬ অংশ + অবশিষ্টভোগী হইবে ।
খ. হিন্দু উত্তরাধিকার আইন
বাংলাদেশে হিন্দু সমাজে সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে প্রচলিত আছে প্রাচীন দায়ভাগ আইন এবং হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯৩৭ সালের বিধবা অধিকার সংরক্ষণ আইন । দায়ভাগ আইন অনুযায়ী সাধারণত পুত্র সন্তানরা প্রথম অগ্রাধিকার পান। তবে সন্তানহীন বিধবা নারী বা কন্যাদের ক্ষেত্রে সম্পত্তিতে নিরঙ্কুশ অধিকার দেয়নি বরং নারীদের ক্ষেত্রে সম্পত্তিতে জীবনস্বত্ব অধিকার দিয়েছে ।
৪ | ২০২৩ সালের আধুনিক সংস্কার এর ফলে ভাগ বণ্টন পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন এসেছে
২০২৩-২৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসনের ভূমি রেজিস্ট্রি ব্যবস্থায় বেশ কিছু সংস্কার করা হয়েছে, যা ওয়ারিশি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনাকে নতুন কিছু দিয়েছে।
১ | ডিজিটাল নামজারি ও স্মার্ট মিউটেশন
বাংলাদেশে বর্তমানে ওয়ারিশি সনদপত্র পাওয়ার পর ই-নামজারি আবেদনের মাধ্যমে ভূমির নামজারি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যার ফলে ভুয়া ওয়ারিশ সাজিয়ে কাউকে দিয়ে জমি ভুয়া রেজিস্ট্রি করার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়েছে ।
২ | ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩
বাংলাদেশে ২০২৩ সালে করা নতুন আইনে জমি জা লিয়াতি, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি বা কোনো বৈধ ওয়ারিশকে তার প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যে কোনো ওয়ারিশ এর সাথে প্রতারণা করে বা ভয়-ভীতি দেখিয়ে তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করলে এজন্য কঠিন জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৩ | বাধ্যতামূলক আপস-বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করা
বাংলাদেশে পূর্বের ন্যায় মৌখিকভাবে পারিবারিক জমিজমা ভাগ বন্টন করলে জমিজমা হস্তান্তরের সময় সমস্যা হয় তাই সকল ওয়ারিশদের সম্মতিতে আপোষ বন্টন দলিল রেজিস্ট্রি করে নিলে জমি হস্তান্তরের সময় কোন সমস্যা হয় না এবং এই জমিজমা নিয়ে ওয়ারিসদের সাথে পরবর্তীতে আর কোন ঝামেলা হয় না ।
৫| ধাপে ধাপে ওয়ারিশ সম্পত্তি বণ্টনের আইনি প্রক্রিয়া
আমাদের পরিবারে যদি উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি বন্টন করার প্রয়োজন হয়, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও আইনি উপায় হবে:
ওয়ারিশ সনদ পত্র সংগ্রহ করা
আমাদেরকে অবশ্যই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে মৃত ব্যক্তির সকল বৈধ ওয়ারিশদের নাম, জাতীয়পরিচয় পত্রের নাম্বার দিয়ে স্মারক সম্বলিত ওয়ারিশ সনদ পত্র সংগ্রহ করতে হবে।
সকল মূল কাগজপত্র একত্রিত করা
মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ থাকতে হবে।
আমাদেরকে জমির মূল দলিল, সিএস/এসএ/আরএস/বিএস খতিয়ান বা পরচা সংগ্রহ করতে হবে।
আমাদেরকে হাল নাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিষদ করে খাজনার রশিদ আনতে হবে।
রেজিস্টিকৃত আপস-বণ্টননামা দলিল করা
সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে একটি আপোষ বণ্টননামা দলিল তৈরি করতে হবে। এই দলিলে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে যে কে কোন খতিয়ানের কোন দাগে কতটুকু অংশ পাচ্ছে এবং তার চৌহদ্দি (সীমানা) কী।
ই-নামজারি বা মিউটেশন সম্পন্ন করা
আপোষ বন্টনদলিল রেজিস্ট্রির করার পরে নিজর নামে খতিয়ান বা পরচা আলাদা করতে সরাসরি ভূমিসেবায় (land.gov.bd) গিয়ে ই-নামজারি আবেদন করতে হবে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে অনুমোদিত হলে আমাদের নামে পৃথক খতিয়ান খোলা হবে।
৬ | ওয়ারিশদের সাথে সমঝোতা না হলে বাটোয়ারা মামলা করতে হবে
অনেক সময় আমাদের পরিবারের কোনো সদস্য জমি ছাড়তে চান না বা অবৈধভাবে সম্পত্তি দখল করে রাখতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আপস-বণ্টন হওয়া সম্ভব না হলে আমাদেরকে আইনের দ্বারস্থ হতে হবে।
বণ্টন বা বাটোয়ারা মামলা :
সম্পত্তি যে এলাকায় ঐ এলাকার জেলার বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা দায়ের করতে হবে ।
আদালতের মাধ্যমে বাটোয়ারা:
আদালত সব দলিলপত্র বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োজন হলে উকিলদের কমিশনার নিয়োগ করে সরেজমিনে জমি আমিন দিয়ে মাপিয়ে প্রত্যেক ওয়ারিশের সীমানা চিহ্নিত করে রায় প্রদান করে।
শেষ কথা
আমাদের সকলের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি সঠিক উপায়ে বন্টন করা প্রতিটি নাগরিকের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। ঠিক সময়মত আইনি প্রক্রিয়া মেনে রেজিস্ট্রি কৃত আপস-বণ্টননামা দলিল করলে ও নামজারি সম্পন্ন করলে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ভূমি জটিলতা, বা পারিবারিক মামলা থেকে মুক্ত থাকা যায় । তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত জমিজমা সংক্রান্ত জটিল যেকোনো বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবী পরামর্শ নেওয়া বা স্থানীয় ভূমি অফিসের নায়েবের সাথে পরামর্শ করা বুদ্ধিমানের কাজ।
